মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১০:০৪ পূর্বাহ্ন

হুমকির মুখে সিডিএসপি বাঁধ

default

মেহরাজ হোসনে, মিরসরাই : চট্টগ্রাম ও ফেনী সীমান্তবর্তী এলাকার ফেনী নদীতে বাস্তবায়ন হওয়া মুহুরী সেচ প্রকল্প কার্যকারিতা হারাচ্ছে। নদীর ভাটি এলাকায় জমে ওঠা পলির স্তরের কারণে স্বাভাবিক গতি বদলে যাচ্ছে।

ভাঙ্গণের কবলে পড়েছে এখানকার সিডিএসপি বাঁধ, বিস্তৃীণ এলাকা ও শত শত মৎস্য ঘের। এতে ১৯৮৫-৮৬ অর্থ বছরে ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হওয়া প্রকল্পটি ভেস্তে যেতে বসেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন বলছে, চলতি বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভেঙ্গে গেলে এখানে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিবে। পাশ্ববর্তী এলাকার মানুষ হারাবে ভিটেবাড়ি, কৃষক হারাবে জমি, নদী গর্ভে বিলীন হবে শত শত মৎস্য ঘের। ব্যাহত হবে এ এলাকায় বাস্তবায়ন হতে যাওয়া দেশের সর্ববৃহৎ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগরের উন্নয়ন কাজ।

কার্যকারিতা হারাবে সেচ প্রকল্প: সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের ভাটিতে প্রায় ৭শ বর্গ মিটার এলাকা পলি জমে ৭৫ ভাগ ভরাট হয়ে গেছে । এতে নদীর পানি প্রবাহের পথ বদলে একদিকে ছোট ছোট চর জেগে উঠছে অন্যদিকে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। আবার সেচ প্রকল্পের বেশ কিছু স্লুইজ গেট(জল কপাট) ইতোমধ্যে পলি জমার কারণে কার্যকারিতা হারিয়েছে। মিরসরাইয়ের ওচমানপুর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা দুখু মিয়া জানান, ২০১৯ সালের শুকনো মৌসুমে প্রকল্পের মুখে বালি ও মাটি জমাট শুরু হয়।

ওই বছর বর্ষা শুরু হলে ভাঙ্গন দেখা দেয়। যা গত ৩৫ বছরেও এখানকার মানুষ দেখেনি। ইতোমধ্যে শতাধিক মৎস্য ঘের নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। এদিকে প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে মুহুরী সেচ প্রকল্পের আওতায় মিরসরাই, ফেনী ও সোনাগাজী উপজেলার ২৭.১২৫ হেক্টর জমি ইরি চাষের আওতায় আসে। আশঙ্কা করা হচ্ছে ভরা বর্ষা শুরু হওয়ার আগে নদীতে পলি জমা এলাকা জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিং করা না হলে একদিকে নদীর উজান এলাকার গ্রামের পর গ্রাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হবে অপরদিকে এখানকার জমিগুলো অনাবাদি পড়ে থাকবে।

সিডিএসপি বাঁধ ভাঙ্গলে বিপর্যয়: মিরসরাইয়ের বিস্তৃন্য জনপদকে বঙ্গোপসাগরের ভাঙ্গণ থেকে রক্ষা করতে ১৯৯৪ সালে চর ডেভেলপমেন্ট এন্ড সেটেলমেন্ট প্রকল্পের (সিডিএসপি) আওতায় বাস্তবায়ন করা হয় ১১.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বাঁধ। এ বাঁধের কারণে এখানকার বাঁশখালী ও ইছাখালী এলাকায় গড়ে ওঠে হাজার হাজার একর মৎস্য ঘের। যা থেকে চট্টগ্রামের মৎস্য খাদ্য চাহিদার ৭০ ভাগ উৎপাদিত হয়।

এদিকে আশঙ্কা করা হচ্ছে জরুরি ভিত্তিতে সিডিএসপি বাঁধের পশ্চিম পাশে সুরক্ষা ব্লক না বসালে চলতি বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভেঙ্গে বড় ধরণের বিপর্যয় দেখা দিবে। সরেজমিন সিডিএসপি বাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের উত্তর অংশের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা ফেনী নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। বাকি অংশটুকু বয়ে গেছে বঙ্গোপসাগর অববাহিকায়। স্থানীয়দের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, একসময় নদী ও সাগর থেকে বাঁধের দূরত্ব ছিল প্রায় ৭শ মিটার। বর্তমানে কোথায় ১০মিটার আবার কোথাও ১৫ মিটার দূরত্ব রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের বর্ষা মৌসুমে গুরুত্বপূর্ণ এ বাঁধ ভয়াবহ ভাঙ্গনের মুখে পড়বে। দেখা গেছে, বিভিন্ন সময় ভাঙ্গন রোধে সরকারের পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে সুরক্ষার জন্য সিসি ব্লক বসালেও বর্তমানে তা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

সিডিএসপি বাঁধের ভাঙ্গন প্রসঙ্গে মিরসরাই উপজেলা চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘এলাকার লোকজন থেকে জেনে এটি আমি সরেজমিন গিয়ে দেখেছি। সেখানে ভয়ংকর অবস্থা। যে কোন সময় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এ বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ নিতে ২০২১ সালে আমরা মাননীয় পানি সম্পদ মন্ত্রী ও সচিব বরাবরে ই-মেইলে একটি চিঠি দিয়েছিলাম। কার্যত এটির কিছুই হয়নি।’

ব্যাহত হবে শিল্পনগর উন্নয়ন: মিরসরাইয়ের বঙ্গোপসাগর উপকূলে জেগে ওঠা ৩০ হাজার একর ভূমিতে দেশের সর্ববৃহৎ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর বাস্তবায়নের কাজ চলছে। যার উত্তরাংশের পুরোটাজুড়ে প্রতিরক্ষার কাজ করছে এখানকার সিডিএসপি বাঁধ। এটির ভাঙ্গণ দেখা দিলে শিল্প নগরের উন্নয়ন কাজ ব্যাহত হবে এমন আশঙ্কা করছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন।

মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহফুজা জেরিন লেন, ‘খুব সহসা পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিবে। এখানকার জনবসতি, মৎস্য প্রকল্প ও বাস্তবায়নাধীন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন কাজ ক্ষতির মুখে পড়বে। আমি বিষয়টি দেখছি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে কথা বলবো।’

মিরসরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ভাঙ্গণের বিষয়টি নিয়ে আমি অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সাথেও কথা বলেছি। তারা এ ধরণের প্রকল্পে অর্থায়ন করতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। পরে আমি বিষয়টি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে যোগাযোগ করেছি তবে এখনো কিছুই হয়নি।’

পাউবোর বক্তব্য: এ বিষয়ে ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আরিফুর রহমান চৌধুরী জানান, নদীর ভাটি এলাকায় জমে থাকা পলি ড্রেজিং এর জন্যে আমরা আরো আগে উদ্যোগ নিয়েছিলাম। এ বিষয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটিও হয়েছিলো। তবে এ বিষয়ে আর কোন অগ্রগতি নেই।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |