মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪২ পূর্বাহ্ন

যুব উন্নয়ন কর্তাদের ‘পকেট উন্নয়ন’

যুব উন্নয়ন কর্তাদের ‘পকেট উন্নয়ন’

নিজস্ব সংবাদদাতা

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির (এনএসপি) দুর্নীতির অভিযোগ তালাশে নেমে ‘কেঁচো খুঁড়তে সাপ’ পেয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। সিলেটের জকিগঞ্জে ২ কোটি ৪৩ লাখ ৯০ হাজার টাকার দুর্নীতির সত্যতা জানতে গিয়ে ১৩ কোটি ৯৫ লাখ ৯৬ হাজার টাকা লোপাটের তথ্য মেলে। ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ রসায়নে এ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিলেও অধিদপ্তর এখনও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এই পটভূমিতে দেশে কর্মসূচির আওতায় থাকা সার্বিক অনিয়ম তদন্তে নতুন কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রণালয়।

উচ্চ মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের শিক্ষিত আগ্রহী বেকার যুবক ও যুব মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানে আগ্রহী করার লক্ষ্যে ২০১০ সালে এনএসপির উদ্যোগ নেয় সরকার। এনএসপি নীতিমালা অনুসারে কৃষি, শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা, গবাদি পশু পালন, চরিত্র গঠনমূলক, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ অন্তত ১০ বিষয়ে তিন মাস প্রশিক্ষণের পর সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বেকার যুবকদের কাজে লাগাতে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়। যাঁরা কাজে যুক্ত হন, তাঁদের দেওয়া হয় দৈনিক ২০০ টাকা ভাতা। এতে অংশগ্রহণকারীরা সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত যুক্ত থাকতে পারেন। কর্মসূচিতে যুক্ত থাকার সময় কেউ অন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে এনএসপির কাজ ছেড়ে দিতে কোনো বাধা নেই। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এ সংক্রান্ত কর্মসূচি নেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পরপরই এ কর্মসূচি নেয় সরকার, যা পাইলটিংয়ের পর পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

২০২১-২২ অর্থবছরে সিলেটের জকিগঞ্জে এ কর্মসূচির প্রায় আড়াই কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর মন্ত্রণালয়ের ক্রীড়া-২ অধিশাখার উপসচিব ফজলে এলাহীকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি গত ৪ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ের যুব-২ শাখার উপসচিব সিরাজুর রহমান ভূঞা স্বাক্ষরিত স্মারকে তদন্তে উঠে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম উল্লেখ করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়।

যাঁদের নাম এসেছে: তদন্তে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক (অর্থ ও অডিট) আলী আশরাফ, হিসাবরক্ষক নুরুল আমিন, সিলেটের জকিগঞ্জের যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আজহারুল কবীর, এনএসপির সাবেক যুগ্ম সচিব জাহাঙ্গীর আলম (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত), এনএসপির সাবেক পরিচালক আবুল ফয়েজ মো. আলাউদ্দিন খান, প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক বাবুল পাটোয়ারি, উপপরিচালক (এনএসপি ও প্রশিক্ষণ) ফারহাত নূর, এনএসপির সাবেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ফজলুল হক এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক জসিম উদ্দিনের নাম এসেছে।

ব্যবস্থা নিতে ধীরগতি: দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে দুই রকম তথ্য পাওয়া গেছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) জানিয়েছেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের সচিব জানিয়েছেন, এ বিষয়ে নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা প্রতিবেদন দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছেন জানিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আজহারুল ইসলাম খান বলেন, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নথি পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত এলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা (ডিপি) চালু হবে। অন্যদিকে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মহিউদ্দীন আহমেদ জানান, কর্মসূচির সার্বিক চিত্র খতিয়ে দেখতে একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগটি ভালো। এটাকে কেন্দ্র করে ১৪ কোটি টাকার দুর্নীতিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব করার সুযোগ নেই। এমন হলে দুর্নীতিবাজরা আরও অনিয়মের সুযোগ পাবে।

যেভাবে টাকা লোপাট: যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং সিলেটের জকিগঞ্জের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী পরস্পর যোগসাজশে ১৪ কোটি টাকা লোপাট করেছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে। দায়ীদের অন্যতম যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক (অর্থ ও অডিট) আলী আশরাফ ১৪ কোটি টাকার দুর্নীতির বড় অনুঘটক বলে জানা গেছে। তিনি আইবাস এ অবৈধভাবে টাকা বরাদ্দ, এন্ট্রি দেওয়া, অনুমোদনের কাজটি সমন্বয় করেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সরকারি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে আলী আশরাফ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন মর্মে প্রমাণিত হয়েছে।’ এ বিষয়ে আলী আশরাফের মন্তব্য জানার চেষ্টায় তাঁকে অন্তত ১০ বার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। এসএমএস পাঠালেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে অভিযোগ ওঠা প্রায় আড়াই কোটি টাকা অবৈধভাবে ওঠানোর তদন্ত করতে গিয়ে এর আগের অর্থবছরেও (২০২০-২১) অবৈধভাবে টাকা উত্তোলনের প্রমাণ মেলে। দেখা গেছে, উল্লিখিত দুই অর্থবছরে সিলেটর জকিগঞ্জ এনএসপির আওতাধীনই ছিল না। তবু যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং জকিগঞ্জের যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে টাকা তোলা হয়েছে।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, অধিদপ্তর থেকে উপজেলা পর্যায়ে টাকার ছাড় পেতে নিশ্চিতভাবে ডিজির অনুমোদন নিতে হয়। যেসব উপজেলায় টাকা যায়, সেখানেও ডিজির সম্মতি পৌঁছার পরেই শুধু ব্যাংকের মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীরা টাকা তুলতে পারেন। একাধিক স্তরে যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকার পরও এত বড় অঙ্কের টাকা কীভাবে লোপাট করা হলো– এমন প্রশ্নের জবাবে অধিদপ্তর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুর্নীতি তো নিয়ম মেনে হয় না।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |