মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫৩ অপরাহ্ন

স্বাস্থ্য খাত ঘুরে দাড়াবে কবে?

স্বাস্থ্য খাত ঘুরে দাড়াবে কবে?

স্বাস্থ্য খাত ঘুরে দাড়াবে কবে?

মোর্শেদ মারুফ : বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর দশা নতুন নয়। কোনোভাবেই ঘুরে দাড়াতে পারছে না স্বাস্থ্য খাত। এ অবস্থাতে মনে হতে পারে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম। কিন্তু সেবার মান বাড়াতে এই খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েও আসছে না কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। এ ছাড়া অনিয়ম তো আছেই। অনিয়মের কথা আসলে বলতে হয়, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আর দুর্নীতি যেন একইসূত্রে গাঁথা। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ক্রয়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটাসহ উন্নয়ন বরাদ্দের শতকরা ৮০ ভাগই দুর্নীতির পেটে চলে যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, মেডিকেল কলেজ ও সরকারি হাসপাতালের অসাধু কর্মকর্তাদের একটি চক্র এই দুর্নীতির মূলহোতা। তারা কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি করছে। এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ১৭ টি নথি গায়েবের ঘটনাও ঘটেছে। থানায় জিডিও হয়েছে। খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নথি গায়েব থেকেই স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির ভয়বহতা বুঝা যায়।

১. ঢাকা মেডিকেল কলেজ ৫,৮০,৭৬,১৭৯ টাকা।
২. শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ১,৪২,০৭,২৯৪ টাকা।
৩. ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ১,৭৮,৩৫,৫০০ টাকা ।
৪. চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ১৩,৩২,২৪,৪৮৭ টাকা।
৫. দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ১,৯৬,৪২,৬০৬ টাকা।
৬. কুমিল্লার এম আব্দুর রহিম কলেজ ১৮,৪৩,১৯,৩২১ টাকা।
৭. রংপুর মেডিকেল কলেজ ১,৬০,১৬,৯৮২ টাকা।
৮. শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ ৯১,১২,৩৪৩ টাকা।

হাসপাতালের জন্য যন্ত্রপাতি না কিনেই ভুয়া বিল-ভাউচারে টাকা তুলে নিচ্ছে। যে দামে যন্ত্রপাতি কিনছে, তার অনেকগুণ বেশি টাকার বিল করছে। আবার প্রয়োজন ছাড়াই মেডিকেল সরঞ্জাম কিনছে। গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য বেশ কয়েকটি মেডিকেল কলেজের কেনাকাটা সংক্রান্ত নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও জনসংখ্যাভিত্তিক জরায়ু মুখ ও স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং কর্মসূচি ও জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (নিপোর্ট) বেশ কিছু কর্মসূচি ও সংস্থার কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

হারিয়ে যাওয়া নথিগুলোর মধ্যে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, ইলেকট্রনিক ডেটা ট্র্যাকিংসহ জনসংখ্যাভিত্তিক জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং কর্মসূচি, নিপোর্ট অধিদপ্তরের কেনাকাটা, ট্রেনিং স্কুলের যানবাহন বরাদ্দ ও ক্রয়সংক্রান্ত নথি। এর বাইরেও নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের একাধিক প্রকল্পের নথি খোয়া গেছে।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৯২৪ কোটি টাকা ব্যয়ের শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ৭ তলা হাসপাতাল ভবনকে ১৫ তলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা। আরো ছিল কলেজের একাডেমিক ভবন ও শিক্ষার্থীদের জন্য ডরমিটরি নির্মাণ। ২০২০ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের ৪০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়। এ সময় প্রকল্পের সময় আরো দুই বছর এবং ব্যয় ১ হাজার ৯৬ কোটি টাকায় উন্নীত করতে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে তখনই কেনাকাটায় নানা অনিয়ম ধরা পড়ে। এরপর পুরো প্রকল্পের নথিপত্র তলব করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এদিকে সরকারি ২০টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৮৪টি ক্রয়সংক্রান্ত ও রাজস্ব আদায়ের বিপরীতে ৫৯ কোটি ২৬ লাখ ৩৪ হাজার ৩২২ টাকার অনিয়ম পেয়ে গত ৩১ জুলাই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় অডিট আপত্তির জবাব চেয়ে চিঠি দিয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অডিট ইউনিটের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি কেনা, আউটসোর্সিং কর্মচারীদের বেতন ও খাবার বিল পরিশোধসহ ১ কোটি ৪২ লাখ ৭ হাজার ২৯৪ টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩ কোটি ৩২ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৭ টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে। দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ কোটি ৯৬ লাখ ৪২ হাজার ৬০৬ টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে। যার মধ্যে রয়েছে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ কিনে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬৪ লাখ ৬১ হাজার ৬৮৩ টাকা। কিশোরগঞ্জের শহীদ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দরপত্রে উল্লিখিত স্পেশিফিকেশন অনুযায়ী সার্জিক্যাল গজ ও ব্যান্ডেজ মাপে কম সরবরাহ করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২ লাখ ৯৩ হাজার ১৫৫ টাকা। কুমিল্লার এম আব্দুর রহিম কলেজ হাসপাতালে ১৮ কোটি ৪৩ লাখ ১৯ হাজার ৩২১ টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ কোটি ৮০ লাখ ৭৬ হাজার ১৭৯ টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে।

মানিকগঞ্জের কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ট্রমা সেন্টারে ১ কোটি ২৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৩৯ টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮০ লাখ ৬২ হাজার টাকার, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৫ লাখ ৭৫ হাজার ৮৯৪ টাকার, গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯১ লাখ ১২ হাজার ৩৪৩ টাকার, বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ কোটি ৩৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৩৮ টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালে ২৯ লাখ ৭৮ হাজার ৫০০ টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে। ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালে ২৫ লাখ ৬৬ হাজার ৯৪৮ টাকার, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ কোটি ৬০ লাখ ১৬ হাজার ৯৮২ টাকার, বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ কোটি ২৩ লাখ ৫২ হাজার ২৩ টাকার, সিরাজগঞ্জের এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বাজারদর অপেক্ষা অধিক মূল্যে ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকার, ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৭ লাখ ৬১ হাজার ৯০০ টাকার, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৮০ হাজার ৩৮৭ টাকার এবং সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার ১০৬ টাকার অনিয়ম পাওয়া গেছে।

আর্থিক এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছে অধিক মূল্যে এমএসআর সামগ্রী ক্রয়, উচ্চমূল্য দিয়ে নিম্নমানের পণ্যসামগ্রী ক্রয়, পরিচ্ছন্নতার কাজ না করা সত্ত্বেও ঠিকাদারকে অর্থ পরিশোধ, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা-সামগ্রী কিনে অর্থের অপচয়, উচ্চ দরদাতাকে কার্যাদেশ, বাজার মূল্য অপেক্ষা উচ্চমূল্যে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়, কোভিড-১৯ চিকিৎসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হওয়া সত্ত্বেও সংঘনিরোধ খাত থেকে ভাতা পরিশোধ ইত্যাদি।

তবে,স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সরকারি হাসপাতালের এসব অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে নিজেরা গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। এ চক্রের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টরা মামলা, তদন্ত কিংবা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও থামানো যায় নি তাদের কর্মকাণ্ড। বদলী করা হলে নতুন কর্মস্থলে গিয়ে সেখানেও নিজের দুর্নীতির আখড়া গড়ে তুলেন, বানিয়ে নেন নিজের অবৈধ সম্পদের পাহাড়।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |