বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৬:৫৯ পূর্বাহ্ন
খায়রুল আলম রফিক : ময়মনসিংহের ১৪ টি উপজেলায় মুঠোফোন অ্যাপসের মাধ্যমে অনলাইন জুয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। লোভে পড়ে বিভিন্ন বয়সের মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণেরা এই জুয়ায় বেশি আসক্ত হচ্ছেন। জুয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে সর্বস্ব হারাতে বসেছেন তাঁদের অনেকে। এ কারণে বাড়ছে পারিবারিক অশান্তি ও দাম্পত্য কলহ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ময়মনসিংহ মহানগরী এলাকা থেকে শুরু করে উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোয় এই জুয়া বিস্তার লাভ করছে। সহজে প্রচুর টাকা উপার্জনের লোভে পড়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন বয়সের অসংখ্য মানুষ এই জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছেন। তরুণদের অনেকেই কৌতূহলবশত এই খেলা শুরুর পরেই নেশায় পড়ে যাচ্ছেন।
প্রথমে লাভবান হয়ে পরবর্তী সময় খোয়াচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। কিছুদিন আগে ত্রিশাল থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রায় ২০ জনকে আটক করেন। এদের মধ্যে সবই শ্রমিক ও শিক্ষার্থী। ত্রিশাল উপজেলার সাখুয়া ইউনিয়নের নওপাড়া, বীররামপুর, বালিপাড়া বাজার, কালির বাজার, ধলা বাজার ও ময়মনসিংহ মহাসড়কের সিএনজির গ্যারেজ গুলোতে খেলা হয় নিয়মিত। তবে ত্রিশাল থানা পুলিশ প্রায় সময়ই অভিযান চালিয়ে আটক করেন। পরে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করেন। অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্মার্টফোনে নির্ধারিত কয়েকটি অ্যাপস ডাউনলোড করে সেখানে জুয়া খেলা চলে।
বিভিন্ন নামের প্রায় ১৫ থেকে ২০টির মতো অ্যাপসে সবচেয়ে বেশি জুয়া খেলা হয়। এসব অ্যাপসে ১০ টাকা থেকে শুরু করে যেকোনো অঙ্কের টাকা দিয়ে শুরু করা যায়। জুয়ায় জড়িত ব্যক্তিরা বলছেন, এসব অ্যাপসের বেশির ভাগই পরিচালনা করা হচ্ছে রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে। বাংলাদেশে এগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধি (এজেন্ট) রয়েছে। ময়মনসিংহ সদরের পরানগঞ্জ, ত্রিশাল, ফুলবাড়িয়া ও ভালুকা উপজেলার প্রায় প্রতিটি বাজারেই রয়েছে এই ধরনের এজেন্ট। তারা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জুয়ায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ বা প্রদান করে থাকে। এজেন্টরা বিদেশি অ্যাপস পরিচালনাকারীদের কাছ থেকে হাজারে কমপক্ষে ৪০ টাকা কমিশন পায়। এজেন্টদের মাধ্যমেই বিদেশে টাকা পাচার হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চলতি বছরের এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী বলেন, প্রথমে ৫০ টাকা বিনিয়োগ করে ১৬ হাজার টাকা পান তিনি।
এতে লোভে পড়ে এই খেলায় মারাত্মক আসক্তি চলে আসে তাঁর। গত ছয় মাসে এই জুয়ার নেশায় পড়ে মোটরসাইক বিক্রি ও বাবার জমানো টাকা নিয়ে পালিয়েছেন তিনি। এমনকি চলতি এইচএসসি পরীক্ষার মধ্যেও তিনি খেলা ছাড়তে পারেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, তাঁর ছেলে স্থানীয় উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। কিন্তু অনলাইন জুয়ার কারণে পড়ালেখায় মনোযোগ নেই। কৌশলে টাকা নিয়ে এটা খেলে। কোনোভাবেই বিরত রাখা যাচ্ছে না। ছেলের ভবিষ্যৎ অনলাইন জুয়া নষ্ট করে দিচ্ছে।
ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা সংস্থা ডিবির অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফারুক হোসেন বলেন, অনলাইনে জুয়া খেলা এটি সাধারণত ভিন্ন কৌশল। মানুষ বিভিন্নভাবে লোভে পড়ে এসব অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে। এই জোয়ার কৌশলে পড়ে অসংখ্য মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব অপরাধ দমনের জন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা প্রয়োজন। জুয়া পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে হুঁশিয়ারি দিয়ে ওসি ফারুক হোসেন বলেন, যারা এখনো ময়মনসিংহ জেলায় অনলাইনে জুয়ার সঙ্গে জড়িত আছেন আপনারা যদি এ খেলা ছেড়ে না দেন তাহলে আপনাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
ত্রিশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন জানান, অনলাইন জুয়ার ব্যাপারে তাঁরা শুনেছেন। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছেন। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনলাইন জুয়া নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানালেন ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জুয়েল আহমেদ । তিনি বলেন, উপজেলার আইনশৃঙ্খলা সভায় এই ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সভা হলে তাদের সতর্ক করা হচ্ছে, যাতে আর্থিকভাবে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব অনলাইন ক্যাসিনো দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত হলেও সমন্বয়ের জন্য দেশীয় সিন্ডিকেট রয়েছে। যারা এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ফেসবুক গ্রুপ বা পেজ খুলে প্রচার চালানো হচ্ছে।