মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০১:৪৩ অপরাহ্ন

চট্টগ্রাম কাস্টমসে ৩৫ ঘাটে ঘুষ

চট্টগ্রাম কাস্টমসে ৩৫ ঘাটে ঘুষ

 বেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম : অটোমেশন পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া, শুল্কায়নের ডিজিটাল পদ্ধতি অ্যাসাইকুডা প্লাস বারবার অকেজো হয়ে পড়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বল্পতা, ঘুষ-দুর্নীতিসহ নানা কারণে ব্যবসায়ীদের কাছে রীতিমতো বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এখানকার কাস্টমস। শুল্কায়নে ধীরগতিতে পদে পদে হয়রানি পোহাতে হচ্ছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস আমদানির ক্ষেত্রে ৩৫ ও রফতানিতে ৯ স্বাক্ষরের পেছনে প্রতিদিন লেনদেন হচ্ছে প্রায় দের কোটি কোটি টাকা ঘুষ। আর এসব কারণে ২০২২-২৩ অর্থবছরে কাস্টমস লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার কম রাজস্ব পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম কাস্টমসের প্রধান কারণ হিসেবে ঘুষ-দুর্নীতিকেই দায়ী করেছেন।

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমদানিপণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ বার্থিং দেওয়ার পর থেকে শুরু হয় ঘুষ-দুর্নীতি। পণ্য আমদানির পর খালাসের জন্য ৩১ খাতে, বন্দর থেকে রিলিজ নিতে ১৮ খাতে এবং বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ১১ খাতে ঘুষ দিতে হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, শিপিং কোম্পানিগুলো জাহাজে কী পণ্য নিয়ে এসেছে তার বর্ণনা কাস্টমসে দাখিল করতে হয়। এগুলোকে বলা হয় ইমপোর্ট জেনারেল মেনিফেস্ট (আইজিএম)। নিয়মানুযায়ী, জাহাজ বন্দরে আসার ২৪ ঘণ্টা আগে কাস্টমসে আইজিএম জমা দিতে হবে। কাস্টমসের নেটিং সেকশনে সেই আইজিএম দাখিলের পর থেকেই শুরু হয় ঘুষ-বাণিজ্য।

আইজিএম যাচাই করতে গিয়ে ঘুষ দিতে হয় পিয়ন, ক্লার্ক, চেকার, বিল আব এন্ট্রি, কম্পিউটার অপারেটর, জরুরি প্রিন্ট, লজমেন্ট সেকশন বা গ্রুপে প্রেরণ, অ্যাপ্রাইজার, প্রধান অ্যাপ্রাইজার, নোটিস প্রিন্ট, আন্ডার ইনভয়েস সামলানো, আউটপাস, সিল মারা, ডিউটি প্রদানে, রিলিজ অর্ডার নেওয়া, অনাপত্তি সিল দেওয়া, মালামাল পরীক্ষার সময় রেপিটর, সাব-ইন্সপেক্টরসহ বিভিন্ন খাতে। এমনকি আমদানিপণ্য ভর্তি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রেও ঘুষ দিতে হয় ইকুইপমেন্ট বুকিং, শেডের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর, ট্রেইলার অপারেটর, টালি ক্লার্ক, ডক শ্রমিক, উইন্সম্যানসহ নানা খাতে। বন্দর থেকে পণ্য বের করার সময় কাস্টমস গেটে যাচাই থেকে শুরু করে বের করার সময় গেট চেকিং পর্যন্ত ঘুষ না দিলে পণ্য বের করা কঠিন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী প্রতিদিনের কাগজকে জানান, একটি কনসাইনমেন্ট কাস্টমস থেকে রিলিজ করতে ঘুষের পরিমাণ গড়ে ক্ষেত্রবিশেষে ১০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়।

টেক্সটাইল মেশিনারিজ, কাগজ ও মন্ড, কসটিক সোডা, প্লাস্টিক মোল্ডিং কম্পাউন্ড, হার্ড বোর্ড বা ডুপ্লেক্স বোর্ড, পার্টস ও মেশিনারি, টিনপ্লেট, কাঠ, গুঁড়াদুধ, এসিড এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ইত্যাদির ক্ষেত্রে ঘুষ দিতে হয় ২০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ৫-১০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয় লিফট, বিভিন্ন ফলজদ্রব্য, প্লাস্টিক জাতীয়দ্রব্য, বিভিন্ন প্রকার তেল, গার্মেন্ট এক্সেসরিস, তুলা, সুতা, ফিল্ম সরঞ্জাম কেমিক্যাল, খাদ্যশস্য ইত্যাদি পণ্যের ক্ষেত্রে। জাহাজ এবং কনটেইনার কোম্পানিগুলো ঢাকার আইসিডিতে পণ্য নিতে সর্বনিম্ন ২০০০-৪০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। আর বাল্ক কার্গোর ক্ষেত্রে ঘুষ গুনতে হয় টনপ্রতি পণ্যে।

ঘুষ-দুর্নীতির প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার কাজী ইরাজ ইশতিয়াক প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, ঘুষ-দুর্নীতির সঙ্গে কারো জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব অভিযোগ আসে তা খতিয়ে দেখা হয়ে থাকে। দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে অনেক সময় তথ্য চাইলে তা দ্রুত দেওয়া হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম কাস্টমসে পণ্য রফতানির চেয়ে আমদানিতে দুর্নীতির পরিমাণ বেশি। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে জাল কাগজপত্র তৈরি করে এক পণ্যের ঘোষণা দিয়ে অন্য পণ্য এনে বের করে নেওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটছে। এক শ্রেণির কর্মকর্তার সহায়তায় এসব কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে হয়ে থাকে। বন্দরের ভেতরে স্ক্যানার মেশিনের দুর্বলতার সুযোগে নানা অপকর্ম হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রে। দেশে মোট রফতানির ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক। আর এ পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে গিয়ে ঘাটে ঘাটে ঘুষ দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। আর না দিয়েও উপায় নেই। কারণ কাস্টমসের প্রচলিত নীতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নানা উছিলায় ফাইল আটকে দেয়। একবার ফাইল আটকালে ৩৫ ঘাটে ঘুষ দিয়ে তা মুক্ত করতে হয়।

পোশাকশিল্পের মালিকরা নানা সময় দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি অবহিত করলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। জনবল সংকটের কারণে চট্টগ্রাম কাস্টমস গতিহীন হারাচ্ছে। কাস্টমসের সংস্থাপন শাখার তথ্য অনুযায়ী, এখানে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১ হাজার ২৪৮টি। এর বিপরীতে মাত্র ৫৬৭ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। পদ শূন্য ৬৮১টি। শূন্য সহকারী পরিচালক (পরিসংখ্যান), প্রোগ্রামার ও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার ছয়টি পদ। ডেপুটি কমিশনারের ১৬টি পদের মধ্য শূন্য ১৩টি। ৪৮৭টি অ্যাসিস্ট্যান্ট রেভিনিউ অফিসার পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৭২ জন। একইভাবে পাঁচটি যুগ্ম কমিশনার পদের বিপরীতে রয়েছেন তিনজন। এ ছাড়া ১১৯টি রাজস্ব কর্মকর্তা পদের বিপরীতে ৭৬, ৪৭টি সহকারী কমিশনার পদের বিপরীতে ৩৪, ৪২৩টি তৃতীয় শ্রেণির স্টাফ পদের বিপরীতে ১৮১ এবং ১৪১টি চতুর্থ ও অন্যান্য পদে বিপরীতে ৯৪ জন কর্মরত রয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যবসায়ীরা বলেন, জনবল সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় রাজস্ব হারাচ্ছে কাস্টমস। আবার জনবলের সংকটের সুযোগে কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী রাতারাতি লাখ টাকার মালিক বনে যাচ্ছেন। আর ফাইলের পেছনে ছুটে নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। কাস্টমস সূত্র জানায়, শূন্যপদের সুযোগ নিয়ে অবৈধভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এক শ্রেণির বহিরাগতরা। প্রায় প্রতিটি শাখায় এসব অস্তিত্ব দেখা যায়। এদের অনেকে কাস্টমস থেকে অবসর নিলেও কাস্টমসে তাদের দুর্দান্ত প্রতাপ এখনো। এদের মাধ্যমেই কর্মরত অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতির অর্থ আদায় করেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাস্টমসের মতো একটি স্পর্শকতার জায়গায় অবৈধ এসব বাইরের লোক কীভাবে কাজ করে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। এসব ‘বদি আলম’ সন্ডিকেটের কাছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়া জিম্মি হয়ে রয়েছে।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |