বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৫:২২ পূর্বাহ্ন

ছয় দিনে ১৩০০ রোগী পঙ্গু হাসপাতালে

ছয় দিনে ১৩০০ রোগী পঙ্গু হাসপাতালে

ছয় দিনে ১৩০০ রোগী পঙ্গু হাসপাতালে

পনের বছরের কিশোর আবদুল হাদী। ঈদের দিন বিকালে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের আমতলী এলাকায় তিন বন্ধুকে নিয়ে মোটরসাইকেলে ঘুরতে বেরিয়েছিল। কিছুদূর যাওয়ার পরই এক অটোরিকশার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে হয়। তাতে মোটরসাইকেল উল্টে রাস্তায় পড়ে যায় তারা। ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কেউ মারা না গেলেও তিন বন্ধুই গুরুতর আহত হয়। এর মধ্যে হাদীর ডান পায়ের হাড় তিন টুকরো হয়ে গেছে। প্রথমে তাদের স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দুজনকে ভর্তি করা হলেও হাদীকে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) পাঠানো হয়। ঈদের দিন থেকেই সে হাসপাতালের ক্যাজুয়াল ব্লক-১ ফ্লোরে শুয়ে কাতরাচ্ছে। পাশেই বসে বাবা ইলিয়াস হোসেন মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। মাঝেমধ্যে ধমকের সুরে বলছেন, আমি বারবার জোরে বাইক চালাতে নিষেধ করেছি, আমার কথা শুনলে তো এত বড় ক্ষতি হতো না।

ছেলের জন্য দুশ্চিন্তার কথা জানিয়ে ইলিয়াস হোসেন বলেন, সোমবার সকালে ডাক্তার এক্সরেসহ বেশ কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ সময় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বেপরোয়া গতিতে বাইক চালানোর কারণে ছেলে দুর্ঘটনায় পড়েছে। যদি পা-টা কেটেই ফেলতে হয় তা হলে সারা জীবন পঙ্গু হয়ে কাটাতে হবে। বাবা হিসেবে এর চেয়ে কষ্ট আর কী হতে পারে। তাদের পাশেই শুয়ে আছেন আরেক যুবক গাজীপুরের জয়দেবপুরের শামীম আহমেদ। তিনি এবার এইচএসসির পরীক্ষার্থী। তিনিও ঈদের পরের দিন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

শুধু এ দুজন জন নন, তাদের মতো প্রতি ঘণ্টায় এমন অনেক রোগী আসছেন পঙ্গু হাসপাতালে। তাদের বেশিরভাগই বাইক দুর্ঘটনার শিকার। বাকিদের কেউ গাড়ি দুর্ঘটনায় বা অন্য কোনো কারণে আহত হয়েছেন। কোনো কোনো রোগীর হাত-পা কেটে ফেলার মতো অবস্থাও রয়েছে। সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছে তিন ও দুই চাকার যানবাহনে। আহতদের বেশিরভাগই বয়সে তরুণ।

সোমবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, এক হাজার শয্যার হাসপাতালে কোনো শয্যা খালি নেই। পুরো হাসপাতালই রোগীতে ঠাসা। রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। পঙ্গু হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে এক্সরে রুম, টিকেট কাটার রুম, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ডাক্তারের রুমের সামনেও দীর্ঘ লাইন। যাদের অনেকে ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। শয্যা না পেয়ে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের মেঝেতে থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে হচ্ছে রোগীদের।

তাদের সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা। পঙ্গু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদের ছুটিতে গত ছয় দিনে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। আর ভর্তি হয়েছেন ৫০০-এর বেশি রোগী। এর মধ্যে ঈদের দিন জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ২৫৬ জন। এর মধ্যে ৭৬ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত। এ ছাড়া অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনের দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৬ জন।

হাসপাতালে মোট ভর্তি করা হয় ১৩০ জনকে। এসব রোগীর মধ্যে ৪৫ জনকে জরুরি বিভাগের অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। ঈদের পরের দিন শুক্রবার ২০৫ জন রোগী জরুরি বিভাগ থেকে সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৮২ জন। আর সোমবার বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সেবা নিয়েছেন ২২৩ জন। ভর্তি করা হয় ৬৬ জনকে রোগীকে।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, ঈদ আনন্দের মধ্যে বেড়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। এ কারণে পঙ্গু হাসপাতালেও রোগীর চাপ বেড়েছে। হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে ৪০ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার।আহতদের অধিকাংশেরই বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এবং আঘাত গুরুতর। আর মোটরসাইকেল ছাড়াও সিএনজিচালিত অটোরিকশায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে। সে তুলনায় বাস ও ট্রাকের দুর্ঘটনা কম। ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গতির কারণেই দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে বলেও মনে করেন চিকিৎসকরা।

পঙ্গু হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগ রোগীই বয়সের তরুণ এবং তারা বেশিরভাগই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। দুর্ঘটনায় কারও দুই পা কিংবা এক পা কাটা আবার কারও দুই হাত অথবা এক হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। এদের অনেকের হাত-পা না কাটা লাগলেও লোহার রড লাগানো অবস্থায় হাসপাতালের বেডে কিংবা মেঝেতে কাতরাচ্ছেন।

হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ভর্তি মোহাম্মদ আলী বলেন, আমি ঈদের পরের তিন ভোলায় শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হই। এক মোটরসাইকেল আরোহীকে সাইড দিতে গিয়ে অটোরিকশাসহ খাদে পড়ে যাই। তাতে পাঁচজন যাত্রীর মধ্যে সবাই কম-বেশি আহত হয়েছি। আমার মাথাসহ হাত-পায়ে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছি। এক হাত ও পা ভেঙে গেছে। তিনি বলেন, গুরুতর আহত হয়ে প্রাণে বাঁচলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছে। দুর্ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলে জানান আরেক রোগীর বাবা ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, আমার ছেলে পুরোপুরি সুস্থ হবে কি না জানি না, হলেও কত দিন লাগবে কে জানে।

পঙ্গু হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আবাসিক এক চিকিৎসক  বলেন, প্রতি বছরই ঈদ ও ঈদ-পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি থাকে। এবারও ব্যতিক্রম নেই। আমাদের এখানে স্বাভাবিক সময়ে দিনে গড়ে এক থেকে দেড়শ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের একটি অংশ থাকেন মোটরসাইকেল সড়ক দুর্ঘটনায় আহত। হাসপাতালে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে জায়গা না হওয়ায় অনেককে বারান্দায় চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে অর্থোপেডিক সোসাইটির মহাসচিব ও পঙ্গু হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গতি, চালকের অসাবধানতা-অদক্ষতা, লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, রাস্তার স্বল্পতা-অপ্রশস্ততা, প্রতিযোগিতামূলকভাবে গাড়ি চালানো ও ওভারটেকিং এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। তিনি বলেন, আহতদের অধিকাংশেরই বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে এবং আঘাত গুরুতর। আহতদের রক্তনালি ছিঁড়ে যাওয়া, ওপেন ফ্র্যাকচার, হাড় ভাঙা, হাড়ের ইনফেকশন।

মূলত এরাই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। যেহেতু সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের বেশিরভাগের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি। এর মধ্যে দুর্ঘটনায় অনেকের পা কেটে ফেলার মতো অবস্থা হয়েছে। এতে রোগীর জীবন ও পরিবার হুমকির সম্মুখীন। অনেককেই আবার সারা জীবনের পঙ্গুত্ববরণ করতে হবে। তাই দুর্ঘটনা রোধে সবাইকে সচেতন ও সতর্কভাবে নিয়ম মেনে গাড়ি চালাতে হবে।

এদিকে গত বুধবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত রাজধানীসহ আশপাশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ১২০ জন আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে রোববার রাত পর্যন্ত চারজন মারা গেছে। সোমবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে এ তথ্য জানা যায়।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, বুধবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত ঢাকাসহ আশপাশ এলাকা থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ১২০ জনের মতো আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছিল। তাদের মধ্যে চারজন মারা গেছে। বাকিদের বেশিরভাগই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছে।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |