পাখি আক্তার (ছদ্মনাম)। বয়স ২২। বাড়ি নেত্রকোনার জেলার মদন উপজেলায়। ছিল সুখের সংসার। হঠাৎ স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ায় কাজের সন্ধানে যান গাজীপুর জয়দেবপুরে। কোনো কাজ না পেয়ে পরিচিত একজনের মাধ্যমে জড়িয়ে পড়েন বাসা-বাড়িতে যৌনকর্মে। কখন যে এ পেশায় সক্রিয় হয়ে উঠলেন, তা বলতে গেলে নিজেও জানেন না।
প্রথমে তার তিন বছরের জন্য ঠাঁই হয়েছিল টাঙ্গাইলের কান্দারপাড়া পতিতালয়ে। সেখান থেকে বর্তমানে আছেন ময়মনসিংহে পতিতালয়ে। সরেজমিনে কথা হয় পাখির সঙ্গে। তিনি প্রতিদিনের কাগজকে জানান, এখানে কেউ ইচ্ছে করে আসেন না, নিরুপায় হয়েই আসেন। তার এ কাজ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না বলেই এ পেশায় আসতে হয়েছে। এখানে যারা এসেছেন তারা কেউই ইচ্ছে করে আসেননি, অন্যকিছু করার উপায় না পেয়ে কিংবা ফাঁদে পড়েই অধিকাংশ যৌনকর্মী এ পেশায় জড়িয়ে পড়েন। পাখি আরও জানান, এখানে আসার পরে প্রথমে অনেক কাস্টমার পেতেন। তখন দিনে ২০-২৫ লোক আসত। দিনকাল ভালোই যাচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে কাস্টমার কমে গেছে। আবার কথিত সাংবাদিকদের চাঁদা দিতে হয়। না দিলে গোপনে ছবি তুলে ফেসবুকে ছেড়ে দেয়। এলাকার মানুষ যেন না দেখে তাই লাজ-লজ্জায় তাদের কিছু টাকা দেই। আমাদের অনেক কষ্ট হয়।
সবকিছুর দাম বাড়ার সঙ্গে ঘর ভাড়া দিয়ে নিজেদের পেট চালাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। নেই স্বাস্থ্যের তেমন যত্ন, চিকিৎসাসেবা কিংবা সুখের সন্ধান। শুধু পাখিই নয়, শত শত নারীর গল্প এমনই। বিউটি, বেদেনা,পাপিয়া, সুইটি, তমা, মোনালিসা, শাবনূরসহ অনেকেই প্রতিদিনের কাগজকে জানান তাদের দুঃখ ও হতাশার কথা। যারা অন্যের মনোরঞ্জনে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্ভ্রম ও দেহ বিলিয়ে দেন, তাদের মনের খবর রাখে না কেউ। এনজিওটির স্বাস্থ্য সহকারী মাহবুবা শাহরিন আলমিরা প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, মেয়েদের আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন যৌনরোগ সম্পর্কে সচেতন করি। কিন্তু তারা এসব রোগ সম্পর্কে সচেতন হতে চান না। এখানে নানা বয়সের বিভিন্ন শ্রেণির লোক আসে।
যার বেশিরভাগ লোকজন দৈহিক মিলনে কনডম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনাগ্রহী। কাস্টমারদের ইচ্ছা ও বেশি টাকার লোভে বেশিরভাগ মেয়েই প্রতিনিয়ত অনিরাপদ যৌনমিলন করে থাকে। এতে করে এইচআইভিসহ (এইডস) বিভিন্ন ধরনের প্রাণঘাতী যৌন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তিনি আরও জানান, গত এক মাসে এই পল্লীর ১০৯ যৌনকর্মীর নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ২৩ জন সিফিলিয়ায় আক্রান্ত।
এ রোগটি অনিরাপদ যৌনমিলনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শাহানূর আক্তার (ছদ্মনাম) নামে এক যৌনকর্মী বলেন, আমরা সব মেয়েই এখানে একটি চক্রের কাছে জিম্মি। তাই এখানে আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভাবার সুযোগ নেই। পল্লীতে এখন এমনিতেই গ্রাহক কম আসে। তাই সবাই যেকোনো উপায়ে গ্রাহক নিজের কাছে নিতে মরিয়া হয়ে থাকেন। তাই গ্রাহকদের খুশি করতেও অনেক সময় কনডম ব্যবহার করতে পারি না। পুলিশ সর্ম্পকে পাখি বলেন আগে পুলিশ খুব বিরক্ত করতো। এখন আর পুলিশ ভিতরে কম আসে। আমাদের সমস্যা হলে সমাধান করে যায়। আগে পুলিশ মারতো,এখন আর মারে না বরং অসুস্থ হলে টাকা দেয়,সাহায্য করে।
পল্লীর সর্দারণী (বাড়িওয়ালী) লাভলী বেগম জানান, ‘আগে এখানে দিনরাত কাস্টমারে ভরা থাকত। এখন কাস্টমার খুবই কম আসে। যার জন্য মেয়েদের (যৌনকর্মী) নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আর আগের মতো কনডম ফ্রি দেওয়া হয় না, তাই কনডম কিনে অনেকেই ব্যবহার করতে চায় না। এসব ব্যাপারে গণমাধ্যমকর্মী এডভোকেট রায়হানুল সাগর বলেন, যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগকে পর্যাপ্ত তৎপর হতে হবে। যারা এ পেশা ছাড়তে চান, তাদের পুনর্বাসন ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।
ময়মনসিংহে যৌনপল্লীতে মাদকসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং ভাসমান যৌনকর্মীদের মাধ্যমে অনিরাপদ যৌনমিলনে যাতে যৌনবাহিত রোগের বিস্তার না ঘটে এ ব্যাপারেও স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন ডা.সাইফুল ইসলাম জানান, যৌনকর্মীদের হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। আর কোনো যৌনকর্মী হাসপাতালে না আসতে পারলে, সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মী পাঠিয়ে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
আপনার মতামত লিখুন :