গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিন হত্যা মামলা: সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু

আখতার হোসেন , বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম

গাজীপুরে তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। হত্যা মামলার বাদী ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের গাজীপুরের স্টাফ রিপোর্টার নিহত সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনের বড় ভাই সেলিমের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) দুপুরে এই সাক্ষ্যগ্রহণকে সাংবাদিক সমাজ বিচারিক ব্যবস্থার একটি “ঐতিহাসিক মাইলফলক” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

চার্জ গঠনের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়া বাংলাদেশের সাংবাদিক হত্যা মামলার ইতিহাসে বিরল, ব্যতিক্রমী ও নজিরবিহীন ঘটনা।

গত ৭ আগস্ট গাজীপুরের ব্যস্ততম চান্দনা চৌরাস্তার মাঝখানে প্রকাশ্য দিবালোকে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনকে কুপিয়ে হত্যার যে বর্বর দৃশ্য দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল, তার বিচারিক পরিণতির পথে এবার দৃশ্যমান অগ্রগতি শুরু হলো। চার্জ গঠনের পর দ্রুত গাজীপুর আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার, সহকর্মী ও সারাদেশের সাংবাদিক সমাজে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

বুধবার দুপুরে প্রধান অভিযুক্ত কেটু মিজান,ওরফে কোপা মিজান  তার স্ত্রী গোলাপিসহ অভিযুক্ত ৮ আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেন।

মামলার বাদী ও নিহত সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনের বড় ভাই সেলিমের দীর্ঘ প্রায় দুই ঘণ্টার সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচারিক লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচিত হয়। 

আইনজীবীরা বলছেন, এটি শুধু একটি মামলার অগ্রগতি নয়; বরং সাংবাদিক হত্যা বিচারে রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছারও একটি বড় পরীক্ষা।

দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এখনো মামলা স্থানান্তর না হলেও সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিনের পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত চন্দ্র সরকার বলেন, চার্জ গঠনের পর এত দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ সত্যিই ইতিবাচক। আমরা ইতোমধ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের আবেদন করেছি। অনুমোদন পেলে ৫–৬ মাসের মধ্যেই বিচার শেষ করা সম্ভব।

তবে এখনো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের সরকারি অনুমোদন না পাওয়ায় কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে। তবুও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুকে সাংবাদিক সমাজ ইতিবাচক মোড় হিসেবে দেখছে।

দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ পত্রিকার সম্পাদক ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের প্রধান মো. খায়রুল আলম রফিক বলেন, গত ৫৪ বছরে দেশে ৬৯ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশ হত্যার বিচার হয়নি—এটি জাতির জন্য লজ্জার। সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যার বিচার যদি শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়, তবে সেটিই হবে একটি ব্যতিক্রমী নজির।

তিনি আরও বলেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিলে ৯০ দিনের মধ্যেই রায় সম্ভব। আমরা গত ৩–৪ মাস ধরে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানিয়ে আসছি, কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবুও আজ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ায় প্রথমবারের মতো মনে হচ্ছে—এই বিচার আমরা সত্যিই দেখতে যাচ্ছি।

মামলার বাদী ও নিহত তুহিনের বড় ভাই সেলিম বলেন, গত ৩–৪ মাস ধরে দ্রুত বিচার চেয়ে আবেদন করছি। আজ দীর্ঘ সময় ধরে সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে। এটি আমাদের পরিবারের জন্য বড় স্বস্তির বিষয়। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।

সাংবাদিক নেতারা বলছেন, এই মামলায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হলে বাংলাদেশে সাংবাদিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই দেশজুড়ে সাংবাদিক সমাজ কালো ব্যাজ ধারণ, মানববন্ধন, প্রেস ক্লাব কর্মসূচি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় তোলে। সারাদেশে একটাই স্লোগান উচ্চারিত হয়, “তুহিন হত্যার বিচার চাই, দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, তুহিন শুধু একজন সাংবাদিকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন সত্যের কণ্ঠস্বর। তার মৃত্যু ছিল সাংবাদিকতা, সমাজ ও গণতন্ত্রের ওপর সরাসরি আঘাত। বিচার বিলম্বিত হলে সেই ক্ষত আরও গভীর হতো।

তুহিন হত্যা মামলায় চার্জ গঠন, দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ ও ধারাবাহিক শুনানি—সব মিলিয়ে বিচারিক অগ্রগতি একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা আর ধামাচাপা দেওয়া যাবে না।

সাংবাদিক মহলের দৃঢ় বিশ্বাস, তুহিন হত্যার বিচার কার্যকরভাবে সম্পন্ন হলে এটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। প্রশ্ন এখন একটাই—রাষ্ট্র কি এবার সত্যিই প্রমাণ করবে, সত্যের কণ্ঠ কখনো রুদ্ধ করা যায় না?

Advertisement

Link copied!