আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে মোবাইল ফোন বহনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় শাখার পাঠানো চিঠি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ছাড়া কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে ভোটকেন্দ্রের কাছাকাছি যেতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্তের পেছনে উদ্দেশ্য হিসেবে ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখা, গোপনীয়তা নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম প্রতিরোধের যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে।
উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই ভালো। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সিদ্ধান্ত বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
আজকের দিনে মোবাইল ফোন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এবং তরুণ ভোটারদের ক্ষেত্রে মোবাইল ছাড়া বাইরে বের হওয়া প্রায় কল্পনাতীত। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে ভোটকেন্দ্র এলাকায় মোবাইল নিষিদ্ধ করা হলে অনেক ভোটারই অনিচ্ছাকৃতভাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন। এতে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সাংবাদিকদের ভূমিকা। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় সাংবাদিকদের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। প্রশ্ন ওঠে, একজন সাংবাদিক কি কলম-খাতা হাতে নিয়েই দায়িত্ব পালন করবেন? আধুনিক সাংবাদিকতা কি আর শুধু কলমে সীমাবদ্ধ? ছবি, ভিডিও, লাইভ আপডেট—সবকিছুই এখন মোবাইলনির্ভর। মোবাইল ছাড়া সংবাদ সংগ্রহ কার্যত অসম্ভব। সাংবাদিকদের মোবাইল ব্যবহারে অনিশ্চয়তা থাকলে নির্বাচন কাভারেজ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়।
বিশ্বের বহু দেশে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আছে, কিন্তু সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বিরল। কোথাও কোথাও ছবি তোলা বা ভিডিও করা নিষিদ্ধ, আবার কোথাও গোপন বুথে মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ—এমন সীমিত বিধিনিষেধ রয়েছে। আমাদের দেশেও একই ধরনের বাস্তবসম্মত ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারত।
নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু কঠোর নির্দেশ দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। বরং ভোটারবান্ধব পরিবেশ, স্পষ্ট নিয়ম এবং সবার জন্য সমান ও যুক্তিসংগত আচরণই আস্থা তৈরি করে। মোবাইল নিষেধাজ্ঞার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভোটারদের মানসিকতা, সাংবাদিকদের পেশাগত বাস্তবতা এবং আধুনিক সময়ের চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি ছিল।
নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা—এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হবে। অন্তত ভোটারদের জন্য সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত মোবাইল বহনের সুযোগ, আর সাংবাদিকদের জন্য স্পষ্ট ও আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হোক। গণতন্ত্রের উৎসব যেন নিয়মের কঠোরতায় ফিকে না হয়ে যায়—এটাই কাম্য।
মোঃ খায়রুল আলম রফিক
সভাপতি
বাংলাদেশ অনলাইন সংবাদপত্র সম্পাদক পরিষদ (বনেক) কেন্দ্রীয় পরিষদ।
আপনার মতামত লিখুন :