ছাড়পত্র ছাড়াই উদ্বোধন,পরের দিনেই বিস্ফোরণ: দগ্ধ-১৬, আইসিইউতে-৩ জন

মনসুর আলম মুন্না , স্টাফ রিপোর্টার, কক্সবাজার

প্রকাশিত: ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬, ০৩:৫১ পিএম

কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকায় উদ্বোধনের পরদিন বুধবার সন্ধ্যায় একটি এলপিজি গ্যাস পাম্পে বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত ১৬ জন দগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে গুরুতর দগ্ধ ছয়জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দগ্ধদের সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে দগ্ধ তিনজনকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

শহরের বাইপাস সড়কে হোটেল-মোটেল জোনের পূর্ব দিকে বাইপাস সড়কে নির্মিত আদর্শ গ্রামে 'কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন' নামে ওই পাম্পটি গত মঙ্গলবার উদ্বোধন করা হয়। পরদিনই সন্ধ্যায় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই জনবহুল স্থানে পাম্পটি চালু করা হয়েছিল। ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।

এদিকে বিস্ফোরণে দগ্ধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের খোঁজ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রাতে কক্সবাজার-৩ আসনের এমপি ও বিএনপি নেতা লুৎফুর রহমান কাজলকে মোবাইল ফোনে কল দিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে জানতে চান। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দেন।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পাম্পের ট্যাঙ্কের পাইপ ফুটো হয়ে গ্যাস নির্গত হয়ে আগুন ধরে যায়। কর্মচারীরা বালু ও পানি ছিটিয়ে আগুন নেভান। রাত সাড়ে ১০টায় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আবার আগুন ধরে যায়। আগুন আশপাশের ঘরবাড়ি, গাড়ির গ্যারেজ ও পার্কিংয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় দগ্ধ হন ১৬ জন। পাম্পটির পার্শ্ববর্তী একটি গ্যারেজের কর্মচারী নুরুল আলম জানান, আগুনে তাঁর গ্যারেজে মেরামতের জন্য রাখা ৩০টির বেশি গাড়ি পুড়ে গেছে।

এদিকে পাম্পটির মালিক এন আলম দাবি করেন, পাম্পের ছাড়পত্র আছে। তদন্ত কমিটির কাছে কাগজপত্র যথাসময়ে উপস্থাপন করবেন। দগ্ধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে আছেন তিনি।

তবে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন বলেন, পাম্পটি নির্মাণের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি নেওয়া হয়নি। পাম্প মালিক এন আলমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্যাসের ফুটো থেকে বিস্ফোরণ ও আগুনের সূত্রপাত। মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে ও গ্যাস পাইপে ফুটো বন্ধে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট কাজ করেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিদর্শক মুসাইব ইবনে রহমান বলেন, পাম্প নির্মাণে ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। তবে একই মালিক অন্য জায়গায় আরেকটি পাম্প নির্মাণের অনুমোদন নিয়েছেন।

গতকাল সকালে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে। ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাঁচ দিনের মধ্যে কমিটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দেবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চমেকে ভর্তি ছয়জনের সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ভর্তি ছয়জন হলেন— আবদুর রহিম, সিরাজ, আবু তাহের, আবুল কাওসার, মো. সাকিব ও মো. মোতাহের। চমেক বার্ন ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রফিক উদ্দিন আহমদ বলেন, আহতদের মধ্যে আবু তাহেরের শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ, আবদুর রহিমের ৫০ শতাংশ, সিরাজের ৪০ শতাংশ, সাকিবের ৩০ শতাংশ এবং আবুল কাওসার ও মোতাহেরের শরীরের প্রায় ২০ শতাংশ পুড়ে গেছে। শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের অবস্থা সংকটাপন্ন। এর মধ্যে দগ্ধ আবু তাহের, আবদুর রহিম ও সিরাজকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. রাশেদ উল করিম বলেন, দগ্ধ তিনজনকে আইসিইউতে নিয়ে অন্যদের অবস্থা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছি আমরা।

গতকাল দিনব্যাপী ক্ষতিগ্রস্ত গ্যাস পাম্পটিতে ভিড় করেন কক্সবাজারের পরিবেশকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের দাবি, ব্যস্ত সড়কের পাশে জনবহুল এলাকা থেকে ওই গ্যাস পাম্পটি সরিয়ে নিতে হবে। কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও কলাতলীর বাসিন্দা জিসান উদ্দিন বলেন, এমন জনবহুল এলাকায় গ্যাস পাম্প নির্মাণ ঝুঁকিপূর্ণ।

Link copied!