সারা বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত, জর্জরিত একটি দ্বীপের নাম হাতিয়া, এই দ্বীপের মূল কয়েকটি সমস্যার মধ্যে প্রধান একটি নদী ভাঙন। আর দ্বীপের নদীভাঙন একটি জাতীয় দূর্যোগে পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর মেঘনার প্রবল স্রোতে বিলীন হয় হাজারো ঘরবাড়ি ও জমি। প্রকল্প আছে অর্থ বরাদ্দও হচ্ছে কিন্তু নেই সময়মতো কাজ, নেই কোন টেকসই পদক্ষেপ।
হাতিয়া আজ শুধু একটি দ্বীপ নয়। এটি হয়ে উঠেছে একটি ধ্বংসস্তূপের পথিক। এই জনপদের ঘরবাড়ি স্কুল কলেজ মসজিদ কবরস্থান সব হারিয়ে যাচ্ছে নদীতে। গত এক দশকে প্রায় ২০ হাজার পরিবার নদী ভাঙ্গার শিকার হয়েছে। বিগত কয়েকটি বছরে মেঘনা নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে অন্তত ৮ কিলোমিটার। ভাঙন রোধে কোন কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। কেবলমাত্র আশ্বাস আর কাগজের প্রকল্পের কাহিনী। প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বাজেট হয় নদী ভাঙন রোধে, কিন্তু বাস্তবে কাজ হয় সামান্যই।
প্রকল্প আসে, টেন্ডার হয়, কিন্তু কাজ হয় নামের মাত্র। শেষ ১০ দশ বছরে প্রায় ১০ হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে মেঘনার করাল গ্রাসে।
অবহেলিত, জর্জরিত হাতিয়া দ্বীপের প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষের সবচেয়ে বড় দুঃখ নদীভাঙন। মেঘনার উত্তাল ঢেউয়ে প্রতি বছর ভেঙে পড়ছে বসতঘর, ফসলি জমি, স্কুল, মসজিদ, কবরস্থান, বড় বড় দালানসহ হাটবাজার। বছরের পর বছর ধরে চলা এ ভাঙন হাতিয়ার মানুষকে করেছে নিঃস্ব ও গৃহহীন।
নদীর করাল গ্রাসে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে রয়েছে নদীপাড়ের হাজার হাজার পরিবার। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে আশার বাণী শোনালেও এখন পর্যন্ত হয়নি এর স্থায়ী কোনো সমাধান।
হাতিয়ার হরনী, চানন্দী, সুখচর, নলচিরা, চরঈশ্বর ও সোনাদিয়া ইউনিয়নের মানুষ এ ভাঙনের সবচেয়ে বড় শিকার। স্বাধীনতার পর থেকে বহু প্রাথমিক বিদ্যালয়, মসজিদ, মাদ্রাসা, সরকারি-বেসরকারি ভবন, ঐতিহ্যবাহী হাটবাজার নদীতে বিলীন হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভাঙতে থাকায় এরই মধ্যে বসতভিটে হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছে হাজার হাজার পরিবার। একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করেও রক্ষা হয়নি নিজেদের বসতি। নতুন করে ঘর গড়ার স্বপ্ন দেখার সাহসটুকুও হারিয়ে ফেলেছে অনেকেই।
চরইশ্বর ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকায় দেখা গেছে, নিজের ভিটেমাটি হারিয়ে নদীর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন এক বৃদ্ধা। মিনমিন করে কী যেন বলছেন। পাশে নিজেদের খালি ভিটায় পায়চারি করছেন পঞ্চাশোর্ধ কয়েকজন নারী। কি করবেন ভাগ্যের নির্মম পরিহাস।
শোভা রানী (৫৫) বলেন, দুইটি ছেলে মানুষের নৌকায় মাছ ধরে। সামান্য যা কিছু আনে তা দিয়ে কোনরকম খাই না খাই দিন কাটাই। কোথাও মাথা গুজার ব্যবস্থা নেই। একটা মেয়ে বিয়ের বয়সী। এটা যেন গলার কাটা। কি যে করবো কিছুই বুঝতেছি না।
কথা হয় বৃদ্ধ রবিউল হোসেনের (৬৫) সঙ্গে। তিনি বলেন, এক সময় জায়গা-জমি সবই ছিল। বাড়ির সামনে স্কুল-মসজিদ ছিল। সাতবার নদীভাঙনে পড়ে সর্বহারা হয়ে গেছে। এখন নদীর একেবারে ঢালে কোনোরকম বসবাস করছি। জোয়ার এলে ঘরে থাকতে পারি না। এ বর্ষায় বর্তমান ভিটেও টিকবে না। সামর্থ্য নেই যে উপরে কোথাও গিয়ে স্থায়ী একটা ভিটা বাঁধব। অনেক আগ থেকে শুনতেছি এখানে ব্লক বাঁধ হবে; কিন্তু বাস্তবে কোনো খবর নেই।
নদীর পাড়ে নিজের শূন্য ভিটায় বসে থাকা জাকিয়া খাতুন (৬০) বলেন, ২০ বছর আগে আমার স্বামী মারা গেছে। নদী চারবার ঘর নিয়ে গেছে। এখন খালি ভিটা পড়ে আছে। কিন্তু সামর্থ্য নাই যে মাথাগোঁজার ঠাঁই নেব। রাত হলে অন্যের ঘরে থাকি। দিন হলে মানুষের বাড়িঘরের কাজ করি, পারলে খাই না পারলে উপোস থাকি। আমাদের কেউ
দেখার নাই।
শুধু শোভা রানী বা রবিউল হোসেন আর জাকিয়া খাতুন নয়, তাদের মতো শত শত মানুষ প্রতিবছর নদীতে ভিটেমাটি হারাচ্ছেন। কোনো সরকারি সহায়তা না পেয়ে তারা আশ্রয় নিচ্ছেন বাঁধের ধারে, সরকারি খাসজমিতে কিংবা আত্মীয়দের বাড়িতে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে মেঘনার ভাঙন বৃদ্ধি পায়। তবে এ বছর ভাঙনের মাত্রা অতীতের চেয়ে অনেক বেশি। এতে বাজারসহ আশপাশের এলাকাও হুমকির মুখে পড়েছে। নদীভাঙন রোধে দীর্ঘদিন ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বারবার দাবি জানানো হলেও স্থায়ী কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি।
তারা আরও জানান, নদীভাঙনে শুধু ঘরবাড়ি নয়, হাতিয়ার মানুষ হারাচ্ছেন তাদের একমাত্র জীবিকার উৎস ফসলি জমি। ফলে কৃষকরা কর্মহীন হয়ে চরম সংকটে পড়ছেন। জেলেরা নদীর ভয়াবহ রূপে মাছ ধরা থেকেও দূরে থাকছেন। গরিব মানুষ প্রতিদিনের খাবার জোটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সেইসঙ্গে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাবঞ্চিত হচ্ছে,
শিক্ষকরা অন্যত্র বদলি হচ্ছেন আর অভিভাবকরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (হাতিয়া) প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, নদীভাঙন রোধে হাতিয়ার বেশ কয়েকটি জায়গায় জিও ব্যাগ দিয়ে প্রতিরক্ষামূলক বাঁধের কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া ঘাট এলাকায় জিও ব্যাগ এবং জিও টিউব দিয়ে প্রতিরক্ষা কাজ শুরু হয়েছে। এবারে ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী অস্থায়ীভাবে প্রতিরক্ষা কাজগুলো হাতে নেওয়া হয়েছে। নদীভাঙন রোধে যতটুকু সম্ভব আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
নোয়াখালী জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, হাতিয়ার নদীভাঙন একটি পুরোনো সমস্যা। এখানে বারবার ভাঙনের কারণ হচ্ছে নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও প্রবল জোয়ার-ভাটা হয়। যতদিন স্থায়ীভাবে নদীশাসন ও তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ না হবে, ততদিন এ দুর্ভোগ চলতেই থাকবে। তবে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের বিষয়টি কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
হাতিয়ার নদীভাঙন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি এখন একটি মানবিক বিপর্যয়। যেভাবে প্রতিনিয়ত মানুষ সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে, তাতে মনে হয় এ অঞ্চলের মানুষ যেন রাষ্ট্রের আলো থেকে বঞ্চিত এক নিখোঁজ জনগোষ্ঠী। তাই নদীভাঙন রোধে এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন হাতিয়াবাসী।
আপনার মতামত লিখুন :