বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখনো পর্যন্ত কোনো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে সংঘবদ্ধ এই চক্র।
অভিযোগ রয়েছে, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করে রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে উঠছেন এসব কর্মকর্তা। সর্বশেষ ‘সুফল (টেকসই বন ও জীবিকা)’ প্রকল্পে বাগান সৃজন না করেই দেড় কোটির বেশি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বন অধিদপ্তরের একটি চক্রের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, গত এক বছর ধরে এই অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি বন বিভাগে ‘ওপেন সিক্রেট’ হলেও এখনো কোনো কার্যকর তদন্ত হয়নি। বরং অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সাদেকুর রহমানকে শাস্তির পরিবর্তে ডেপুটি রেঞ্জার পদে পদোন্নতি দিয়ে কক্সবাজারের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা বন বিভাগের ‘লোভনীয় পোস্টিং’ হিসেবে পরিচিত।
তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ নভেম্বর উপবন সংরক্ষক উম্মে হাবিবা চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে চিঠি দিয়ে কুমিরা রেঞ্জে ৭০ ও ১০ হেক্টরের দুটি বাগান সৃজনে ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের তালিকা ৭ দিনের মধ্যে পাঠাতে নির্দেশ দেন। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও সেই তালিকা তার দপ্তরে পাঠানো হয়নি।
এর আগে ২২ এপ্রিল পাঠানো আরেক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে কুমিরা বিটে ১৭০ হেক্টর বাগানে জীবিত চারাগাছের হার মাত্র ৬০.২০ শতাংশ, যেখানে ন্যূনতম ৮০ শতাংশ থাকার কথা। একইভাবে ১০ হেক্টরের আরেক বাগানে জীবিত চারার হার পাওয়া যায় মাত্র ৫০.৪০ শতাংশ, যা সন্তোষজনক নয় বলে উল্লেখ করা হয়।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাদেকুর রহমানসহ তিন কর্মকর্তা এই অর্থ আত্মসাতে জড়িত। অভিযোগ উঠেছে, তারা পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটকে ঘুষ দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তা হলেন-কক্সবাজার ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদেকুর রহমান, উপবন সংরক্ষক (ডিসিএফ) এস.এম কায়চার (বর্তমানে চট্টগ্রাম বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের পরিচালক) এবং সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) জয়নাল আবেদীন, যিনি বর্তমানে হবিগঞ্জে কর্মরত।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাদেকুর রহমান বলেন, “আমি এখানে নতুন দায়িত্বে আছি, এ বিষয়ে ডিএফওর সঙ্গে কথা বলুন।” এস.এম কায়চারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্যদিকে জয়নাল আবেদীন বলেন, “আমি অভিযুক্ত, তাই কিছু বলতে পারব না।”
সূত্র আরও জানায়, বনায়নের নামে এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ধামাচাপা দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি ও পদোন্নতির মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, এই ঘটনায় পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন ইউনিটের উপবন সংরক্ষক উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধেও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে, যদিও তিনি গণমাধ্যমে তা অস্বীকার করেছেন।
সার্বিকভাবে, দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের এই ঘটনায় বন বিভাগে অস্থিরতা বিরাজ করছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
আপনার মতামত লিখুন :