ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার আমবাগিচা আবাসিক এলাকায় একটি ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস লাইটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৬ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের সবাই নারী শ্রমিক বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করে পুলিশ বিএনপি নেতা ও আগানগর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমান উল্লাহ মাস্তান (৫৫)–কে গ্রেপ্তার করেছে।
রবিবার (৫ এপ্রিল) দুপুরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে। পরে আদালতে হাজির করা হলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রবিবার সকালে সরেজমিনে পোড়া কারখানা পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, অগ্নিকাণ্ডে বিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপ অপসারণে ফায়ার সার্ভিস ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এ কাজে সহায়তা করছেন স্থানীয় স্কুল-কলেজের স্কাউট সদস্যরা এবং আশপাশের বাসিন্দারা। উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এস্কেভেটরের মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। এর মাধ্যমে ভেতরে আটকে থাকা সম্ভাব্য অবশিষ্টাংশ উদ্ধার এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিরূপণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
শনিবার (৪ এপ্রিল) দুপুরে আগানগর ইউনিয়নের কদমতলী এলাকায় অবস্থিত ‘এসআর গ্যাস লাইটার’ কারখানায় হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স–এর সাতটি ইউনিট প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পরপরই কারখানার ভেতরে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভয়াবহ ধোঁয়া ও তাপে শ্রমিকরা বের হওয়ার সুযোগ পাননি। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগুন লাগার সময় কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। এতে শ্রমিকরা ভেতরে আটকা পড়ে দগ্ধ হয়ে মারা যান। বেঁচে ফেরা কিশোরী শ্রমিক ফাহিমা জানায়, প্রাণ বাঁচাতে সে প্রায় ১০ ফুট উঁচু দেয়াল টপকে পালিয়ে আসে।
অগ্নিকাণ্ডের পর উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো এতটাই পুড়ে যায় যে প্রথমে অনেকের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে স্বজনরা মর্গে গিয়ে ব্যক্তিগত সামগ্রী দেখে তাদের শনাক্ত করেন।
শনাক্ত হওয়া নিহতরা হলেন—দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ আমবাগিচা লন্ডনী হাউজের দেলোয়ারের মেয়ে মিম আক্তার (১৭), মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার আলিনগর ইউনিয়নের ফুলবাড়িয়া গ্রামের আজিজ কাজীর ছেলে শাহিনুর (৩৫) ও পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালিশ্বরী এলাকার কবিরহাটী গ্রামের জসিম দুয়ারীর স্ত্রী মঞ্জু বেগম। স্বজনদের কেউ চাবির গুচ্ছ, কেউবা চুলের ক্লিপ দেখে প্রিয়জনকে শনাক্ত করেন—যা পুরো ঘটনাকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে। বাকি মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার কাজ চলছে।
অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ কয়েকজনকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট–এ ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে জিসান (১৭) ও মরিয়ম বেগমের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক। তাদেরকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওমর ফারুক বলেন, এখনো হাজেরা বেগম ওরফে পারভিনসহ অন্তত তিন জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সঙ্গে অশনাক্ত মরদেহগুলোর মিল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য একটি হেল্প ডেস্ক চালু করা হয়েছে। কেউ নিখোঁজ থাকলে তথ্য দিলে তা যাচাই করা হবে।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক সোহেল রানা বাদী হয়ে হত্যা ও শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় কারখানার মালিক আকরাম উল্লাহ, তার ছেলে এবং ইমান উল্লাহ মাস্তানসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৫ থেকে ৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্যদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওমর ফারুক জানান, ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিকে এক কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এর আগেও একবার উক্ত কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সে সময় ফায়ার সার্ভিস জানায়, প্রতিষ্ঠানটি শুধুমাত্র ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেওয়া একটি ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছিল। কারখানাটির প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না বলেও উল্লেখ করা হয়। ওই ঘটনার পর প্রশাসন কারখানাটি বন্ধ করে দেয়। তবে কিছুদিন না যেতেই সেটি পুনরায় চালু করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কেরানীগঞ্জ সিটি ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি ও বিএনপি নেতা ইমানউল্লাহ মাস্তান তার প্রভাব খাটিয়ে মালিক আকরাম উল্লাহকে কারখানাটি আবার চালু করতে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেন।
স্থানীয়দের দাবি, আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা এই কারখানাটির কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না। সেখানে বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থ মজুত রাখা হলেও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ কিংবা ন্যূনতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। এর আগেও অগ্নিকাণ্ডের পর কারখানাটি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও প্রভাবশালীদের সহায়তায় সেটি পুনরায় চালু করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানাটিতে অমানবিক পরিবেশে কাজ করানো হতো। কোনো অনিয়মের প্রতিবাদ করলে চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হতো, এমনকি অনেক সময় শ্রমিকদের বেতনও আটকে রাখা হতো।
নিহতদের স্বজনদের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ও ঘটনাস্থলের পরিবেশ। তারা এ ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে দাবি করেছেন। স্বজনদের অভিযোগ, অগ্নিকাণ্ডের সময় কারখানার গেট তালাবদ্ধ থাকায় ভেতরে থাকা শ্রমিকরা বের হতে পারেননি, ফলে প্রাণহানির ঘটনা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। তারা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি এবং নিহত ও আহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের পরিবারকে তাৎক্ষণিক দাফন সম্পন্ন করার জন্য প্রত্যেককে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে দুই লাখ টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য এক লাখ টাকা করে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিল থেকে এই অনুদান প্রদান করা হবে।
এদিকে, গতকাল সকালে পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের মর্গে গিয়ে নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নিপুণ রায়। এ সময় তিনি নিহতদের পরিবারকে প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
কেরানীগঞ্জের এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের পর ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত তদারকি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা অননুমোদিত কারখানাগুলোতে ঝুঁকি আরও বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেরানীগঞ্জের এই অগ্নিকাণ্ড কোনোভাবেই ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে উপেক্ষা করা যাবে না—এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, চরম অবহেলা এবং প্রভাবশালীদের দায়হীনতার এক নগ্ন উদাহরণ। একের পর এক সতর্কতা উপেক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা চালু রাখার ফলেই এই মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে।
তদন্তের নামে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি বন্ধ করে প্রকৃত দায়ীদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে এমন মৃত্যুমিছিল থামানো সম্ভব হবে না। অন্যথায়, এই ট্র্যাজেডি কেবল একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি ভবিষ্যতের আরও বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়াবে। এখনই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে, এই রক্তের দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই।
স্থানীয়দের দাবি, যারা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত—প্রশাসন কিংবা কোনো দলের প্রভাবশালী হোক—তাদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনা হবে।
আপনার মতামত লিখুন :