জামালপুরে গরু চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরুষশূন্য জনপদ, আতঙ্কে এলাকাবাসী

এস.এম হোসেন আছাদ , ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ০৬:১১ পিএম

জামালপুর সদরের পূর্ব কোটামনি এখন যেন এক আতঙ্কগ্রস্ত জনপদ। গরু চুরির একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিরোধের সূত্রপাত, তা ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে ভয়, অনিশ্চয়তা আর প্রতিশোধের আশঙ্কায় ঘেরা এক মানবিক সংকটে। গত ২৬ মার্চ গভীর রাতে নাজনিন আক্তার পপি ও তার পরিবার ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ গোয়ালঘর থেকে শব্দ পেয়ে চমকে ওঠেন তারা। বাইরে বেরিয়ে দেখেন- তিনটি গরু নিয়ে পালানোর চেষ্টা করছে কয়েকজন। পরিবারের চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এলে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়।

স্থানীয়দের সহায়তায় কয়েকজনকে আটক করা হয় এবং গরুগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ঘটনাস্থলেই অভিযুক্তরা চুরির কথা স্বীকার করেছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। গভীর রাতের এই ঘটনার পর সকালে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় একটি সালিশি বৈঠক বসে। সেখানে আপাতদৃষ্টিতে বিরোধের ইতি ঘটে- অভিযুক্তরা স্ট্যাম্পে লিখিত অঙ্গীকার দেয়, ভবিষ্যতে এমন অপরাধ আর করবে না। কিন্তু সেই আপসই যেন নতুন এক অস্থিরতার বীজ বপন করে।

ঘটনার দিনই বেলা ১১টায় আসামি সুরুজ মিয়ার স্ত্রী জোসনাবানু নিজ ঘরে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় ১০ জনের নামে এবং অজ্ঞাত আরও ৫/৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সালিশি বৈঠকে জড়িতদের বাদ দিয়ে গ্রামের নিরীহ মানুষকে এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, কিছুদিন না যেতেই পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযুক্ত পক্ষ উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই একটি মামলা দায়ের করে। শুধু তাই নয়, গত ১২ এপ্রিল গভীর রাতে নিজেদের লাকড়ি রাখার ঘরে আগুন লাগিয়ে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে। এর ঠিক একদিন পর, ১৩ এপ্রিল বিকেলে, নতুন করে আতঙ্ক নেমে আসে নাজনিনদের বাড়িতে। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তরা দলবদ্ধভাবে এসে হামলা, মারধর ও লুটপাটের চেষ্টা চালায়। সেই সঙ্গে আবারও গরু চুরির হুমকি এবং প্রাণনাশের ভয় দেখানো হয়।

নাজনিন আক্তার পপির কণ্ঠে এখন শুধু আতঙ্কের ছাপ। তিনি বলেন, 'আমরা এখন প্রতিদিন ভয়ে থাকি। কখন কী হয়, সেই আশঙ্কা নিয়েই দিন কাটছে। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারি না।' গ্রামের চিত্রও বদলে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, মামলার পর থেকেই অনেক পুরুষ গ্রাম ছেড়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন। ফলে পুরো এলাকা কার্যত পুরুষশূন্য হয়েছে। বাড়িগুলোতে এখন শুধু নারী, শিশু আর বৃদ্ধদের নিঃশব্দ উপস্থিতি, যাদের দিন কাটছে ভয় আর অনিশ্চয়তায়। একজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাদের অনেকেই বাদ গেছে। উল্টো নিরীহ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। এখন সবাই আতঙ্কে আছে।' এদিকে, পুরো ঘটনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপের দাবি জোরালো হচ্ছে।

জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, সবগুলো ঘটনার সঠিক তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, প্রমাণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একজন নিরীহ মানুষও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয় মাথায় রেখে কাজ করছে পুলিশ।

তবে তদন্তের আশ্বাসে আপাতত স্বস্তি ফিরছে না এলাকাবাসীর মনে। তাদের দাবি, দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক। কারণ, একটি গরু চুরির ঘটনা এখন আর শুধু একটি অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পরিণত হয়েছে একটি গ্রামের সামাজিক স্থিতি, নিরাপত্তা এবং মানুষের মৌলিক শান্তি হারানোর গল্পে।

Advertisement

Link copied!