দুই দফা হামলায় দিশেহারা পরিবার, বাজিতপুরে জমি বিরোধে মানবিক সংকট

ইফরানুল হক সেতু , হাওর অঞ্চল (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:১১ এএম

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার হুমাইপুর ইউনিয়নের উজাইখালী গ্রামে জমি দখলকে কেন্দ্র করে একই পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুই দফা হামলা, মারধর, শ্লীলতাহানি ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বকুলা খাতুন বাদী হয়ে আদালতে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছেন।

প্রথম ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট দুপুরে। অভিযোগে বলা হয়, আসামিরা সংঘবদ্ধ হয়ে দা, লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বকুলা খাতুনের বসতবাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে। বাধা দিলে তাকে মারধর করে গুরুতর জখম করা হয় এবং তার পরনের কাপড় টেনে শ্লীলতাহানি করা হয়। এ সময় ঘরে থাকা নগদ প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, স্বর্ণালংকার, কাপড়চোপড় ও অন্যান্য মালামাল লুট করে নেওয়া হয়।

এছাড়া ঘরের দরজা, বেড়া ও টিনের চাল ভাঙচুর করে প্রায় ৩ লাখ টাকার ক্ষতি সাধন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। হামলায় তার গর্ভবতী মেয়েও আহত হন, যার ফলে গর্ভের সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেয়। মামলায় উল্লেখিত হামলাকারীদের মধ্যে হিরু মিয়া, মতি মিয়া, চিনু মিয়া, হিনু মিয়া, দুদু মিয়া, মিন্টু মিয়া, আহাদ মিয়া ও মোহাম্মদ আলীর নাম উল্লেখযোগ্য।

পরবর্তী আরেকটি ঘটনা ঘটে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে। এতে একই এলাকার অভিযুক্তরা পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে বাদীর বসতভিটা দখল করে নেয় বলে অভিযোগ করা হয়। তারা বসতঘর ভেঙে ফেলে, টিনের ঘর খুলে নিয়ে যায় এবং বাথরুম ও রান্নাঘর ধ্বংস করে। এ সময় স্বর্ণালংকার, চাল, আসবাবপত্র, ফ্রিজসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী লুট করা হয়, যার মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী বকুলা খাতুন বলেন, তার এক সন্তান মানসিক ভারসাম্যহীন এবং আরেক ছেলে প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে পালিয়ে রয়েছে। তিনি আরও জানান, “আমি একজন বৃদ্ধা মানুষ। তাদের ভয়ে গত এক বছর ধরে পার্শ্ববর্তী অষ্টগ্রাম উপজেলায় অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হিরু মিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, উক্ত জমি তাদের নিজস্ব এবং তারা বৈধভাবেই সেখানে অবস্থান করছেন।

এ বিষয়ে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও হুমাইপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বলেন, এলাকায় দুই দফা লোকজন নিয়ে সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু হিরু মিয়া ও তার লোকজন সালিশের সিদ্ধান্ত অমান্য করে পুনরায় নিরীহ বকুলা খাতুনের বাড়িতে হামলা চালায়।

এ বিষয়ে বাজিতপুর থানার উপ-পরিদর্শক (তদন্ত কর্মকর্তা) মুশফিকুর রহমান বলেন, “অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।”

এ বিষয়ে বাজিতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ জালালদ্দিন বলেন, “আমি মাত্র একদিন হলো এই উপজেলায় দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ভুক্তভোগীর দাবি, তার স্বামীর মৃত্যুর পর পিতার দেওয়া হেবা দলিল অনুযায়ী জমির মালিক হলেও আসামিরা জোরপূর্বক তা দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। তিনি আরও জানান, আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় থানায় অভিযোগ করতে বাধা ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার আপোষ-মীমাংসার চেষ্টা ব্যর্থ হলে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন।

এ বিষয়ে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাগুলো বিচারাধীন রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী।

Link copied!