রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিয়মিত বাড়িভাড়া ভাতা গ্রহণ করার পরও সরকারি রেস্ট হাউসকে বছরের পর বছর ব্যক্তিগত আবাসিক ফ্ল্যাট হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে শেরপুর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে।
ময়মনসিংহে কর্মরত থাকাকালে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি প্রকল্পের ২৯২ কোটি টাকা হরিলুটের সঙ্গেও তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয় অনুসন্ধান করছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে শেরপুর জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সরকারি রেস্ট হাউসের একটি কক্ষ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দখল করে বসবাস করছেন তিনি। অথচ ওই কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের জন্য পাঁচটি সুসজ্জিত কোয়ার্টার বরাদ্দ থাকলেও সেগুলো ব্যবহার না করে কৌশলে নামমাত্র ভাড়ায় বা প্রায় বিনামূল্যে গেস্ট হাউস দখলে রেখেছেন।
দাপ্তরিক বিধিমালা অনুযায়ী, গেস্ট হাউস বা ডাকবাংলো মূলত সরকারি সফরে আগত কর্মকর্তাদের সাময়িক অবস্থানের জন্য ব্যবহারের কথা। কিন্তু নুরুজ্জামান চৌধুরী নির্ধারিত কোয়ার্টার খালি রেখে এই সরকারি স্থাপনাকে স্থায়ী আবাসনে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, তিনি প্রতি সপ্তাহের রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নিয়মিত সেখানে অবস্থান করেন।
শুধু তাই নয়, রেস্ট হাউসের একটি কক্ষকে অবৈধভাবে ব্যক্তিগত রান্নাঘরে রূপান্তর করেছেন। কক্ষের ভেতরে ফ্রিজ, মাইক্রোওভেন, গ্যাস সিলিন্ডার ও চুলা স্থাপন করে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করায় সরকারি আসবাবপত্র ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি এতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। যা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ২০১৮-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
সরকারি বিধি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের জন্য দৈনিক ভাড়া ৫০ টাকা, অন্যান্য সরকারি দপ্তরের জন্য ১০০ টাকা এবং বেসরকারি ব্যক্তিদের জন্য ২০০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। এর সঙ্গে ১৫ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ প্রযোজ্য।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রেস্ট হাউসের মুভমেন্ট রেজিস্টার বা লগবুকে তার দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের কোনো স্বচ্ছ নথি সংরক্ষণ করা হয়নি। এমনকি নির্ধারিত ভাড়া সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কোনো রসিদ বা চালানের প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, তিনি প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে বাড়িভাড়া ভাতা উত্তোলন করছেন। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা সরকারি রেস্ট হাউস বা ডরমিটরিতে অবস্থান করলে তিনি বাড়িভাড়া ভাতা পাওয়ার অধিকারী নন।
সে ক্ষেত্রে ভাতা গ্রহণের পাশাপাশি রেস্ট হাউস দখলে রাখা রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের শামিল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তিনি শেরপুরে কর্মস্থলে নিয়মিত অবস্থান না করে ময়মনসিংহে পরিবারসহ বসবাস করেন।
প্রতি সপ্তাহে রোববার শেরপুরে এসে বৃহস্পতিবার চলে যান এবং এই সময়টুকুতে অবৈধভাবে রেস্ট হাউস ব্যবহার করেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত উপপরিচালক নুরুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সন্তোষজনক কোনো দাপ্তরিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। বরং বিষয়টিকে ব্যক্তিগত সুবিধা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, “আমি এখানে অতিথি হিসেবে থাকি এবং বিল পরিশোধ করি।”
এছাড়া তার রেস্ট হাউস ব্যবহারের দৃশ্য ভিডিও ধারণ করায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার অনুমতি ছাড়া এখানে কেন আসলেন?”
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সরকারি সম্পদের অপব্যবহার আরও বাড়বে।
আপনার মতামত লিখুন :