সীমান্ত অঞ্চলে সম্পদের সাম্রাজ্য: ৩০ জনকে ঘিরে তোলপাড়

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ০১:২৬ এএম

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন–২

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া সীমান্ত অঞ্চলে হঠাৎ বিপুল সম্পদের মালিক বনে যাওয়া একদল প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়া ৩০ জনের একটি তালিকায় উঠে এসেছে সাবেক এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র, ভাইস চেয়ারম্যান এবং রাজনৈতিক নেতাদের নাম—যাদের অনেকের বিরুদ্ধেই নামে-বেনামে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার তালিকা থেকে  জানা যায়, হালুয়াঘাট উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি মাহমুদুল হক সায়েমের বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। তার নামে প্রায় ১০০ একর আবাদি জমি, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং উপজেলা পরিষদের সামনে পাঁচটি দোকান দখল নিয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়। তালিকা উল্লেখ করা হয় তিনি এমপি থাকাকালে  সীমান্তভিত্তিক অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন এই সাবেক এমপি।

একই উপজেলার আওয়ামী লীগ সভাপতি সাবেক এমপি জুয়েল আরেং-এর নামও আলোচনায় রয়েছে। তার রাংরাপাড়ায় তিনতলা বাড়ি ও অন্তত ৬ একর জমি ছাড়াও রাজধানী গুলশান এবং ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ফ্ল্যাট ও সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। যার পরিমান ৫৬০ কোটি টাকা। এছাড়াও ঘড়ির মেকার থেকে শতকোটি টাকার মালিক আব্দুর রহমানের নামও উল্লেখ করা হয় গোয়েন্দা তালিকায়। এছাড়া সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমানের টাঙ্গাইলের মধুপুরে মার্কেট এবং ঢাকা-ময়মনসিংহে একাধিক ফ্ল্যাট থাকার তথ্য উঠে এসেছে। নারী জনপ্রতিনিধিদের মধ্যেও সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে।

 সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ঝর্ণা ঘোষ ও সুরাইয়া বেগমের নামে আবাদি জমি ও বাড়ির তথ্য মিলেছে। একইসঙ্গে সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শেখ রাসেল, শাখাওয়াত হোসেন ফকির ও ফারুক আহমেদ খানের বিরুদ্ধে ব্যাংকে বিপুল নগদ অর্থ জমা ও স্থাবর সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে।

ধোবাউড়া উপজেলার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ডেভিড রানা চিসিম এবং সাবেক মেয়র খায়রুল আলম ভূঞার নামে ঢাকা ও স্থানীয় এলাকায় বহুতল ভবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি আলোচিত দুই নাম—আওয়ামী লীগ নেতা শামছুল হক ও নূর হোসেন। শামছুল হকের গাজীপুরে ১৩ কক্ষবিশিষ্ট বাড়ি এবং ধোবাউড়ায় বড় ব্যবসা রয়েছে। অন্যদিকে নূর হোসেনের বিরুদ্ধে জমি দখল, একাধিক বাড়ি ও মাছের ফিশারির মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তালিকায় তাদের ‘শত কোটি টাকার মালিক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালান, বালু মহাল দখল, ঠিকাদারি ও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমেই অস্বাভাবিক এই সম্পদ বৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছে। অনেকের ব্যাংক হিসাবে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ থাকলেও তার বৈধ উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনের নামে সম্পদ লুকানোর অভিযোগও রয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তালিকাভুক্ত অনেকেই এখন আত্মগোপনে এবং অনেকেই কারাগারে থাকার তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যদিও তাদের কেউ কেউ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে একে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত’ বলছেন, তবে সম্পদের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, বিষয়টি শুধু আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। তাদের মতে, অবৈধ সম্পদ শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা নিশ্চিত করা হলে জনমনে আস্থা ফিরবে। হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার সাধারণ মানুষের মুখে এখন একটাই দাবি—“তদন্ত হোক, সত্য বেরিয়ে আসুক।”

Advertisement

Link copied!