একসময় কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা নির্ভর শান্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা গত ১৬ বছরে নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে সেই সাথে বদলে গেছে নামসর্বস্ব কিছু মানুষের ভাগ্যের চাকা।। স্থানীয় সূত্র, অভিযোগ ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে—আওয়ামী লীগের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাত ধরে এখানে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার কোটি টাকার অঘোষিত সম্পদের সাম্রাজ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র ও ভাইস চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৬ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। মাছের খামার, ফিডমিল, জুতার কারখানা,জুট ব্যবসা, জমি-বাড়ি, রাজধানীতে ফ্ল্যাট, বিদেশে টাকা পাচার, বিলাসবহুল জীবনযাপন—সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে প্রভাবনির্ভর এক শক্তিশালী অর্থনৈতিক বলয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সম্পদের বড় অংশই এসেছে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বনভূমি দখল, নিয়োগ বাণিজ্য এবং শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির মাধ্যমে। ভালুকার শিল্প এলাকা ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী ‘সম্পদ সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে, যেখানে সাধারণ উদ্যোক্তাদের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব। সংশ্লিষ্টদের দাবি, উপজেলা জুড়ে একই ধরনের চিত্র দেখা গেলেও ভালুকায় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
ভালুকা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হাজী রফিকুল ইসলামের এক সময় "নুন আনতে পান্তা ফুরায়" অবস্থা থেকে হবিরবাড়ীতে অবস্থিত ফ্যাক্টরীর বদৌলতে অন্যায় প্রভাব খাটিয়ে ফ্যাক্টরীর জুট ব্যাবসা থেকে শুরু করে সকল ব্যাবসা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। রয়েছে কয়েক কোটি টাকার গাড়ী মাস্টারবাড়ী ছাড়াও রাজধানী ঢাকায় একাধিক বাড়ি ও বিলাশবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে।বিগত উপজেলা নির্বাচনে হাজার কোটি টাকা খরচ করে বাগিয়ে নিয়েছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান এর পদটিও। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১২০০ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে, আর তার সম্পদ দেখাশোনা করছেন কিছু সুবিধাবাদী রাজনৈতিক কর্মী।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ভালুকা পৌরসভার সাবেক মেয়র ডা. একে এম মেজবাহ উদ্দিনের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। দায়িত্বকালীন সময়ে টেন্ডার ও সরকারি প্রকল্প নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে। তিনি মেয়র থাকাকালীন সকল কাজের ঠিকাদার নিজেই ছিলেন বলে পৌরবাসীদের নিকট থেকে জানা যায়।
সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আবুল কালামের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে।তিনি একাধারে উপজেলা চেয়ারম্যান,এমপি ধনুর বোন জামাই হওয়ার কারনে তার প্রভাব ছিলো সবচেয়ে বেশি। এই প্রভাবে তার উপজেলা চেয়ারম্যান এর অফিস ছিলো একটা অঘোষিত আদালত। অফিস করার পরিবর্তে তিনি সারাদিন জমিজমার শালিশ দরবার নিয়ে ব্যাস্ত থাকতেন।জমির বিচার করতে গিয়ে তিনি নিজেই জমি নিয়ে নিতেন নামমাত্র দামে।পরে বিভিন্ন প্রভাবশালী ও ইন্ডাস্ট্রির মালিকদের নিকট বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা কামাতেন।
অনেক ক্ষেত্রে জমি মূল্য মালিককে পরিশোধ করতেন না। এরকম অনেক ভুক্তভোগি আছেন যারা বিচার চাইতে গিয়ে জমিও গেছে টাকাও পাননি।এছাড়া জুট ব্যবসা,জুতার কারখানা,বিপুল স্থাবর সম্পত্তি,বনের জায়গা দখল করে মার্কেট করে বিপুল অর্থনৈতিক লাভবানের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সাবেক এমপি কাজিম উদ্দিন আহম্মেদ ধনুর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৯০০ কোটি টাকা বলে গোয়েন্দা তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার বাণিজ্য ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে এ সম্পদ গড়ে ওঠে।তিনি ভালুকা সরকারি হাসপাতালের রোগীদের ২ টাকা করে টিকিট বিক্রির টাকাও আত্মসাৎ করেছেন। প্রতিটি শিল্পকারখানা থেকে চাঁদাবাজি, জুটব্যাবসা,জমি দখল করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।তার জুলুম অত্যাচার,অবৈধ সম্পদ অর্জনের ঘটনা নিয়ে ইতোপূর্বে অনেক দৈনিক জাতীয় পত্রিকায় একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন সাবেক এমপি মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ, যার দেশ-বিদেশে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন ধরে এই বিপুল সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টি কার্যকরভাবে নজরদারিতে আনতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় প্রভাবশালীরা নির্বিঘ্নে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পেরেছেন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের সম্পদ এখন দেখভাল করছেন বিভিন্ন সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। এমনকি রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নতুন ক্ষমতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
প্রশ্ন রয়ে গেছে
ভালুকার সাধারণ মানুষের,প্রশ্ন—এই বিপুল সম্পদের উৎস কী? উন্নয়নের নামে বরাদ্দ হওয়া অর্থ কোথায় গেল? আর কবে নাগাদ এসব সম্পদের প্রকৃত হিসাব জনসমক্ষে আসবে?
গোয়েন্দা সংস্থার প্রস্তুত করা তালিকা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যক্তিই পলাতক এবং কারাগারে থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আপনার মতামত লিখুন :