আজিম হাওলাদার: ঢাকার গুলশানকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠক শফিউল্লাহ আল মুনিরকে ঘিরে একাধিক মামলা, অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদন ও আদালতের আদেশ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে একটি জটিল ও বিতর্কিত চিত্র। প্রাপ্ত নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে বিনিয়োগ সংগ্রহ, চাকরি ও লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ গ্রহণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, তিনি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তার সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০০৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় র্যাবের এক অভিযানে শফিউল্লাহ আল মুনিরকে আটক করা হয় বলে সে সময়ের একটি সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অভিযানে একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে মাদকদ্রব্য ও আপত্তিকর সামগ্রী উদ্ধারের কথাও জানানো হয়। পরে তিনি ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন এবং বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।
২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের প্রেক্ষিতে তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। আদালত তার আদেশে উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি দেশত্যাগ করলে চলমান তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
দুদকের অনুসন্ধানে তার সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি উঠে এসেছে। তথ্যানুযায়ী, তার নামে প্রায় ১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার সম্পদ পাওয়া গেলেও এর মধ্যে প্রায় ১০ কোটি ৯৫ লাখ টাকার বৈধ উৎসের প্রমাণ মেলেনি। অথচ তার ঘোষিত বৈধ আয় ৫০ লাখ টাকারও কম।
তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার মধ্যে কিছুতে তদন্ত শেষে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। যেমন—মিরপুর, কাফরুল ও শেরেবাংলা নগর থানার কয়েকটি মামলায় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করা হয়।
তবে বনানী ও গুলশান থানার একাধিক মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং এসব মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে।
মামলার বাইরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ব্যবসায়িক অংশীদার করার প্রলোভন দেখিয়ে কোটি টাকা গ্রহণ, বিদেশে পাঠানোর নামে অর্থ নেওয়া, এলপিজি ডিলারশিপ ও ব্যাংক ঋণ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
চাকরি দেওয়ার নামে বিভিন্ন সংস্থায় নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি করিয়ে দেওয়ার নামেও অর্থ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
খাগড়াছড়িতে ইপিজেড, ক্যাবল কার প্রকল্প, খুলনায় চিংড়ি ও ইথানল প্রকল্প এবং নদীতে সাব-জেটি নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্পের নামে বিনিয়োগ সংগ্রহের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব প্রকল্পের নামে জমি ক্রয়, অফিস ব্যয়, বিদেশ ভ্রমণসহ নানা খাতে অর্থ ব্যয়ের তথ্যও উঠে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অর্থ ফেরত চাইলে ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হতো। অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন সময় হুমকি দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এছাড়া চেক ডিজঅনার, ভাড়া বকেয়া এবং মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে বিরোধসহ একাধিক আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সব মিলিয়ে শফিউল্লাহ আল মুনিরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে। যদিও কিছু মামলায় তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন, তবুও একাধিক মামলায় চার্জশিট দাখিল এবং দুদকের তদন্ত চলমান থাকায় বিষয়টি এখনো বিচারাধীন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আদালতের চূড়ান্ত রায় ও তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনই নির্ধারণ করবে এসব অভিযোগের।
আপনার মতামত লিখুন :