ছাত্র রাজনীতির জায়গায় ‘গুপ্ত রাজনীতি’ লেখাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং দেশীয় অস্ত্রের ঝনঝনানিতে পুরো ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনার পর ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলমান স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষ ও স্নাতকোত্তরের পরীক্ষাগুলো যথারীতি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দুপুর ১২টা থেকে থেমে থেমে এ সংঘর্ষ চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এসময় রক্তক্ষয়ী এই সংঘর্ষ কলেজ ক্যাম্পাস ছাড়াও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা গেছে, কলেজের দেয়ালে চিকা মারা বা দেয়াল লিখনকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরেই ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। মঙ্গলবার সকালে এক পক্ষ অন্য পক্ষের লেখা মুছে নিজেদের স্লোগান বা 'গুপ্ত সংকেত' লিখলে বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। এসময় উভয়পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয়। একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। মুহূর্তেই তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। ঘণ্টাব্যাপী ধরে উত্তেজনা চলার পর অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কলেজের একটি ভবনের দেওয়ালে জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে আঁকা একটি গ্রাফিতির নিচে ‘ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’ লেখা ছিল। পরে কলেজ শাখা ছাত্রদলের এক নেতা সেটিতে ‘ছাত্র’ শব্দ মুছে উপরে ‘গুপ্ত’ শব্দ লিখে দেন। সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এর জেরেই সংঘর্ষের সূত্রপাত।
সংঘর্ষ শুরু হলে উভয় পক্ষই লাঠিসোঁটা, রামদা এবং দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কলেজের মূল ফটক থেকে শুরু করে প্রশাসনিক ভবনের সামনে পর্যন্ত দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। কলেজ ক্যাম্পাস এবং আশপাশের এলাকায় চলে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া। এসময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে প্রাণভয়ে দিগিবিদিক ছুটোছুটি করতে থাকেন।
সংঘর্ষে ছাত্রদল- ছাত্রশিবিরের উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন কর্মী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া না গেলেও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কয়েকজনের শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে।
সংঘর্ষের কারণ জানতে চাইলে কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদ বিন সাব্বির জানান, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের ওপর ছাত্রদল হামলা চালিয়েছে। আদর্শিকভাবে দেউলিয়া ছাত্রদল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। ছাত্রদলের হামলায় তাঁদের কয়েকজনের আহত হওয়ার কথা জানান তিনি।
অপরদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে সিটি কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সৈয়দ সিদ্দীকি রনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে শিবিরের নেতা-কর্মীরা আমাদের ওপর হামলা করেছে। এতে আমাদের কয়েকজন আহত হয়েছেন। শিবির এখানেও গুপ্ত রাজনীতি করতে চায়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের অধ্যক্ষ আবু সালেহ মোহাম্মদ নঈম উদ্দিন বলেন, তুচ্ছ দেয়াল লিখন নিয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর এমন সহিংসতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় ক্যাম্পাসে শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করছি। আর কোনো সমস্যা হবে না বলে প্রত্যাশা করি।
এবিষয়ে কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, সংঘর্ষের খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে এবং কোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না বলেও জানান তিনি।
এদিকে সরজমিনে সিটি কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের এই ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। ছাত্রদল ও শিবির উভয় পক্ষই একে অপরকে এই হামলার জন্য দায়ী করছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তাদের একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল। গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কলেজটির নিয়ন্ত্রণ হারায় সংগঠনটি। বর্তমানে ছাত্রদল-শিবির উভয় সংগঠনের কার্যক্রম কলেজে বিরাজমান।
আপনার মতামত লিখুন :