শাস্তির পরও বেপরোয়া স্বাস্থ্যের ক্যাশিয়ার ইমরান মেহেদী

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

বিল্লাল হোসেন মানিক, ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন অফিসে ক্যাশিয়ার পদে কর্মরত ইমরান মেহেদী হাসান আরিফ। ক্যাশিয়ার পদে চাকরি করেও তিনি ময়মনসিংহে বেশ আলোচিত। করেছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ।  আলোচিত হওয়ার কারণ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ। সিভিল সার্জন অফিসের অনেক কর্মচারী মনে করেন, ইমরানই চালান এ কার্যালয়। তার কথায় চলে ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনও। তার কথার বাইরে গেলেই চলে মানসিক অত্যাচার ও হয়রানি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার।  তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেন কোনো কিছুই হয় না। এমনকি বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনও এই ইমরান মেহেদীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য সচিব বরাবরে লিখিত অভিযোগ থেকে এসব তথ্য জানাগেছে ।

ইমরান মেহেদী হাসান আরিফের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের পর  ২০২২ সালের জুলাই মাসে শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন অফিস থেকে মাগুরার শালিখা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি হন এই ইমরান মেহেদী । বদলির কিছুদিন পর থেকে আবারও ময়মনসিংহে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। 

এমনকি ময়মনসিংহে ফিরতে তিনি আশ্রয় নেন জালিয়াতিতে । তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী একজনের স্বাক্ষর জাল করে নিজের বদলির জন্য তদবির করেন। কিন্তু ধরা খেয়ে রাজধানীতে র‌্যাবের হাতে আটক হন। দুই মাস পর জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও শুরু করেন ময়মনসিংহে ফেরার তৎপরতা।

২০২৫ সালের আগস্ট মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নিজের ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন অফিসে বদলির আদেশ করান। কিন্তু ময়মনসিংহের তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাইফুল ইসলাম খান সেই আদেশ গ্রহণ না করে বদলির আদেশে লিখে দেন, ‘মামলা নিষ্পত্তির কাগজ দেখাতে হবে।’এর আনুমানিক দেড় মাস পর সিভিল সার্জনকেই স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। সাবেক সিভিল সার্জন ডাঃ ছাইফুল ইসলামকে বদলি করাতে খরচ করা হয় ৩৫ লাখ টাকা। এভাগ সাবেক  স্বাস্থ্য সচিব ও সাবেক ডিজি পর্যন্ত যায়। এমনটাই জানিয়েছেন সিভিল সার্জন অফিসের এক কর্মচারী। 

ঢাকা সাইবার ট্রাইবুনাল আদালতে বিচারাধীন মামলা থাকার পরেও ইমরান মেহেদী হাসানকে যোগদানের নির্দেশ দেন স্বাস্থ্য  অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ।

এ ঘটনায় ইতিমধ্যে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা। 

তিন দিন পর ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের দায়িত্ব নেন ময়মনসিংহের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. ফয়সাল আহমেদ। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার দিন বিকেলেই ইমরান মেহেদী হাসানের ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন অফিসে ক্যাশিয়ার পদে যোগদান কার্যকর হয়। তারপর শুরু হয় দুর্নীতির রাম রাজত্ব।

ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন অফিসের কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুনরায় যোগদানের পর থেকে ইমরান মেহেদী হাসান বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের ডান হাত হয়ে উঠেছেন। ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের যোগসাজশে নতুন ক্লিনিকের লাইসেন্স, পুরনো ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন, কর্মচারীদের হয়রানি, বদলি, সরকারি চাকরিতে ফিটনেস  সবই যেন ইমরান মেহেদীর ইচ্ছায় হয়। ইমরান মেহেদীর যোগদানের সাত মাসের মধ্যে সিভিল সার্জন অফিসের কর্মচারীরা তাঁর কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের যোগসাজশে ইমরান মেহেদীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন অফিসের আশপাশে পোস্টারও সাঁটানো হয়।

ময়মনসিংহ সিভিল সার্জনের পিএ সুলতান অভিযোগ করে জানান, ক্যাশিয়ার ইমরান মেহেদী হাসান আরিফ যোগদানের পর তার কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। সিভিল সার্জনের মাধ্যমে চাকরি থেকে অপসারণের ভয় দেখিয়েও চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি আরও জানান, সম্প্রতি মেহেদী হাসান সরাসরি তার কাছে টাকা দাবি করে বলেন—টাকা না দিলে তার গোপন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে দেওয়া হবে। এছাড়া তার ব্যবসায়িক লেনদেন সংক্রান্ত একটি ভিডিওকে ঘুষ হিসেবে প্রচার করতে আনিসুর রহমান নামে এক ব্যক্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সুলতান অভিযোগ করেন, মেহেদী হাসান তাকে একটি ইয়ামাহা মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার কথাও বলেন। এমনকি ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনও তাকে “মেহেদীকে ম্যানেজ করতে” বলেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা সামান্য বেতনে চাকরি করি, অথচ আমাকে অন্যায়ভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।” এ ঘটনায় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

তবে পোস্টার চোখে পড়ার পরই তড়িঘড়ি করে সেগুলো অপসারণ করা হয়। ওই পোস্টারে লেখা হয়, ‘ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ফয়সাল আহমেদকে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে আবারও ময়মনসিংহে যোগদান করেন ইমরান মেহেদী।’ ময়মনসিংহ সিভিল সার্জন অফিসের একাধিক কর্মচারী জানান, ডা. ফয়সাল ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জনের দায়িত্ব নেওয়ার পর সাত মাসে ময়মনসিংহের ৩২ জন কর্মচারীকে বদলি করা হয়। যাঁদের বদলি করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কর্মক্ষেত্রে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ ছিল না। কর্মচারীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করতে এসব বদলি করা হয়। ময়মনসিংহের বক্ষব্যাধি ক্লিনিকে ২০১৬ সাল থেকে অফিস সহায়ক হিসেবে কাজ করতেন মিজানুর রহমান। ডা. ফয়সাল আহমেদ ভারপ্রাপ্ত হওয়ার পর মিজানুর রহমানকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে অবনমন করেন।

এ বিষয়ে মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার কোনো দোষ ছিল না।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মচারী বলেন, মূলত ক্যাশিয়ার ইমরানের পরামর্শে কর্মীদের হয়রানি করার জন্য এসব বদলি করা হয়েছে।

ময়মনসিংহে যোগদানের পর থেকে আবার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়নের কর্তৃত্ব পেতে কর্তৃপক্ষ থেকে নানাভাবে হয়রানি করে আসছেন ইমরান মেহেদী হাসান । সম্প্রতি ময়মনসিংহের রাজধানী প্রাঃ হাসপাতাল নামের একটি ক্লিনিককে লাইসেন্স করার জন্য চাপ দেন ইমরান হাসান । তাদের সকল কাগজপত্র থাকার পরেও ইমরান মেহেদী হাসানের সিন্ডিকেট সদস্য দালাল আনিসুর রহমান কে দিয়ে সিভিল সার্জন বরাবরই অভিযোগ দাখিল করেছে। এই অভিযোগ দেওয়ার পর আনিসুর রহমান রাজধানী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ১০ টাকা চাঁদাদাবি করেন। টাকা না দিলে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে হুমকি প্রদান করেন। 

রাজধানী প্রাইভেট হাসপাতালের মালিক আরিফুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে লাইসেন্স আছে সকল কাগজপত্র আছে। তারপরও বারবার তদন্তের নামে আমাকে হয়রানি করা হয়। 

ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন অফিসে গিয়ে কথা হয় ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. ফয়সাল আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ইমরান মেহেদী হাসানের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ তুলে যে পোস্টার করা হয়েছে, সেটি মিথ্যা। আমি এ বিষয়ে জিডি করেছি।’ বদলির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এখানে চাকরি করে আসছিলেন এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন তাঁদের বদলি করা হয়েছে।’ কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি ইমরানকে নিজের কক্ষে ডেকে এনে এ প্রতিবেদকের সামনেই জানতে চান, তিনি পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছেন কি না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহা প্রতিদিনের কাগজ কে বলেন, ‘ইমরান মেহেদী হাসানের বদলির আদেশ মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে করা। কাজেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে কি না সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়।’ আপনার বরাবরের দুটি অভিযোগ জমা হয়েছে এগুলি গায়েব করেছেন কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, গায়েব করব কেন, সময়ের অভাবে তদন্ত করতে পারছি না। পরিচালকের এমন কথা সন্দেহের চোখে দেখছেন সাংবাদিকরা।

Link copied!