সরকারি দায়িত্বে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ডিআইজিআর (ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশন) আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তার নামে-বেনামে ফ্ল্যাট, বহুতল ভবন, জমি, বিলাসবহুল গাড়ি ও বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের তথ্য সামনে আসার পর প্রশাসনিক অঙ্গনজুড়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংস্থা প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিন ধরে রেজিস্ট্রি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল অর্থের মালিক বনে যান আশরাফুজ্জামান। বিশেষ করে জমি রেজিস্ট্রেশন, দলিল যাচাই, মূল্য নির্ধারণ, নামজারি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক অনুমোদনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়ন্ত্রণ, কর্মকর্তা বদলি, পদায়ন এবং প্রভাব খাটিয়ে একটি শক্তিশালী আর্থিক বলয় তৈরি করেছিলেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকার অভিজাত কয়েকটি এলাকায় তার পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের নামে একাধিক ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়া চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকাতেও তার বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিকভাবে অনুসন্ধানকারীরা যেসব তথ্য পেয়েছেন, তাতে এসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একাধিক সূত্র দাবি করেছে, সরকারি চাকরির বৈধ আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই। একজন সরকারি কর্মকর্তার বেতন ও বৈধ আয়ের সীমাবদ্ধতার তুলনায় তার সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিক বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি তার ব্যবহৃত বিলাসবহুল গাড়ি, উচ্চমূল্যের আসবাবপত্র ও বিভিন্ন বিনিয়োগের তথ্যও এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অনিয়মের চক্র সক্রিয় রয়েছে। জমির দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সরকারি ফি’র বাইরে অবৈধ লেনদেন, দলিলের মূল্য কম-বেশি দেখিয়ে কর ফাঁকি এবং প্রভাবশালী মহলের পক্ষে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মতো নানা অভিযোগ বহুদিনের। এসব অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকার অভিযোগও নতুন নয়।
সূত্রগুলো বলছে, আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বেনামে সম্পদ অর্জন। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সহযোগীদের নামে সম্পদ কিনে প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি সম্পদের নথিপত্র যাচাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, তার আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব, স্থাবর সম্পদের রেকর্ড এবং আর্থিক লেনদেনের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি তার দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, বদলি বাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হতে পারে। অনুসন্ধানের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বক্তব্যও নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
রেজিস্ট্রি অফিস সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ জমি রেজিস্ট্রি করতে গিয়ে নানা ধরনের ভোগান্তি ও অতিরিক্ত অর্থ দাবির মুখোমুখি হন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা না দিলে কাজ বিলম্বিত করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের পেছনে শক্তিশালী প্রভাবশালী চক্র কাজ করে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সরকারি চাকরিতে থেকে কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থানকে কার্যকর করতে হলে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি বলেও মত দিয়েছেন অনেকে।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিশ্লেষক বলছেন, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের সম্পদ ও জীবনযাত্রার ধরন নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন। না হলে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ ওঠার পর দ্রুত তদন্ত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তারা।
এ বিষয়ে আশরাফুজ্জামানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তবে অভিযোগকারীরা বলছেন, সবকিছুর সুষ্ঠু তদন্ত হলেই প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধানে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হতে পারে। সেক্ষেত্রে সম্পদের উৎস, অর্থ লেনদেন, কর ফাঁকি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কিছু নথিপত্র সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারি দপ্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান আলোচনার মধ্যেই আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ভূমি ও রেজিস্ট্রি খাতকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়গুলো আবারও সামনে চলে এসেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আপনার মতামত লিখুন :