ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঝড়ের বেগে পিএইচডি থিসিস মূল্যায়নের ঘটনা ঘটেছে। পিএইচডি গবেষক কর্তৃক থিসিস জমা দেওয়ার একদিন পরেই ডাকযোগে প্রেরিত পিএইচডি থিসিসের মূল্যায়ন রিপোর্ট জমা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কন্ট্রোলার অফিসে। আড়াই শতাধিক পৃষ্ঠার থিসিসটি কীভাবে জমা দেওয়ার একদিন পরেই ঝড়ের গতিতে মূল্যায়িত হয়ে রিপোর্ট চলে আসে - তা নিয়ে চলছে বিভিন্ন কানাঘুঁষা। এছাড়াও রয়েছে ভাইবা হওয়ার আগেই অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের এজেন্ডার নথিভুক্ত করার প্রচেষ্টার অভিযোগ।
ঘটনাটি ঘটেছে ল এন্ড ল্যান্ড এডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মেহেদী হাসান এর পিএইচডি থিসিস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে। তার আবেদনের বিষয়টি গত ১৯ মে অনুষ্ঠিতব্য অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের খসড়া এজেন্ডা তালিকার ১৮ নং এজেন্ডা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিয়মানুযায়ী পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে একজন গবেষক যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে থিসিস জমা দেন। এরপরে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর থিসিসটি সিন্ডিকেট কর্তৃক পূর্বেই নিয়োগকৃত পরীক্ষকের কাছে ডাকযোগে মূল্যায়নের জন্য পাঠান। পরীক্ষক তা মূল্যায়ন করে আবারও ডাকযোগে ফেরত দেন। এক্ষেত্রে থিসিসটি মূল্যায়নে ৩০ দিন সময় পান পরীক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কর্তৃক অনুমতিপ্রাপ্তির পর পরীক্ষা কমিটির সভাপতির নিকট পাঠানো হয় মৌখিক পরীক্ষার (ভাইবা) জন্য। পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ভাইবা গ্রহণ করে রিপোর্ট জমাদানের পর তা অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের এজেন্ডাভুক্ত হয়৷
কিন্তু এই পিএইচডি গবেষকের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় ঘটেছে। সূত্র বলছে, সহকারী অধ্যাপক মেহেদী হাসানের পিএইচডি থিসিস পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে জমা দিয়েছেন গত ৯ মে তারিখে। জমাদানের মাত্র দুইদিনের মাথায় ১১ মে তাদের পরীক্ষকের মূল্যায়নের রিপোর্ট জমা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাকযোগে প্রেরণকৃত একটি থিসিস এতদ্রুত সময়ে মূল্যায়ন করে রিপোর্ট চলে আসা কোনভাবেই সম্ভব নয়। হয় এখানে পরীক্ষক থিসিসটি হাতে পাওয়ার আগেই মনগড়া একটি মূল্যায়ন রিপোর্ট প্রস্তুত করে রেখেছিলেন, থিসিস জমার সাথে সাথেই তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন যা সম্পুর্ণ অনৈতিক। অথবা তার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া কার্যত বিধি মোতাবেক হয়নি। তার রিপোর্ট আসার আগেই ভিন্ন কোন উপায়ে তড়িঘড়ি করে জমা করা হয়েছে।
এছাড়া, নিয়মানুযায়ী পরীক্ষকের মূল্যায়নের রিপোর্ট আসার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অনুমতি সাপেক্ষে পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ভাইবার তারিখ ঘোষণা করে মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের চিঠি দেন। কিন্তু এখনো এই পিএইচডি গবেষকের কোন ভাইবা অনুষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু তবুও গত ১৯ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের এজেন্ডার ১৮ নং এজেন্ডায় তাদের পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের এজেন্ডাটি নথিভুক্ত ছিলো। তবে ইবির ভাইস চ্যান্সেলর পদে পরিবর্তন আসায় সেই অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভাটি স্থগিত হয়েছে।
যদিও একাডেমিক শাখার দাবি, কাজের চাপ কমাতে তারা কন্ট্রোলার সেকশন থেকে সম্ভাব্য তালিকা নিয়ে এসে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের এজেন্ডা প্রস্তুত করছিলেন যেটা খসড়া তালিকা। চূড়ান্ত হওয়ার আগে তারা যাচাই-বাছাই করেই নথিভুক্ত করেন। তবে যেখানে এখনো এই পিএইচডি গবেষকের ভাইবার তারিখ ঘোষণাও হয়নি এবং পরীক্ষা কমিটির সভাপতি কন্ট্রোলার সেকশন থেকে চিঠিও পাননি, সেখানে তাদের ডিগ্রী প্রাপ্তির বিষয়টি সম্ভাব্য তালিকাতেই কীভাবে আসলো - সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে পিএইচডি গবেষক সহকারী অধ্যাপক মেহেদী হাসান বলেন, থিসিস টা পরীক্ষকের কাছে পাঠানোর দায়িত্ব আমার না, এটা কন্ট্রোলার অফিস করে থাকে। এই প্রক্রিয়ার একটা নিয়ম আছে, আমি চাইলেই ভিন্নপন্থায় অনুমোদন করিয়ে নেওয়া সম্ভব না। আর এতো দ্রুত মূল্যায়ন রিপোর্ট আসার ব্যাপারেও আমার কোন ভূমিকা নেই। একদিনে রিপোর্ট জমা দিতে আমি কোনধরনের অনুরোধ বা চাপ প্রয়োগ করিনি, আমার সেই সুযোগও নেই। যিনি থিসিস পাঠিয়েছেন আর যিনি মূল্যায়ন করেছেন, তারাই বলতে পারবেন।
এ ব্যাপারে একাডেমিক শাখার সহকারী রেজিস্ট্রার মামুনুর রশীদ বলেন, কাজের চাপ কমাতে সম্ভাব্য তালিকা কন্ট্রোলার অফিস থেকে নিয়ে এসে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের এজেন্ডা গুলোর একটি খসড়া করা হয়। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারিত হলে এজেন্ডা গুলো চূড়ান্ত করা হয়। এসময় কন্ট্রোলার অফিস থেকে অনুমোদনপ্রাপ্ত এজেন্ডা গুলো নথিভুক্ত করে বাকি গুলো খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রেও খসড়া নথিভুক্ত করা হয়েছিল তবে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল স্থগিত হওয়ায় আমরাও আর এজেন্ডা চূড়ান্ত করিনি, স্বাক্ষরও হয়নি। ভাইবা না দিয়ে বা কাজ অসমাপ্ত রেখে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের চূড়ান্ত এজেন্ডার নথিভুক্ত হওয়ার কোন সুযোগ নেই।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. ওয়ালিউর রহমান পিকুল বলেন, এতবড় একটা থিসিস আমি একদিনে কী করে পড়া হলো আর মূল্যায়ন হলো সেটা অবশ্যই প্রশ্নের ব্যাপার। উনি ৯ তারিখে জমা দিয়েছেন, আমি সেদিন ই সই করে ফাইল ছেড়ে দিয়েছি, ১২ তারিখে তাদের মূল্যায়িত রিপোর্ট হাতে এসেছে। এতো দ্রুততার ব্যাপারে অন্যান্য কোন প্রভাব থাকতে পারে তবে আমার উপরে বা আমার দিক থেকে কোন প্রভাব নেই। বিষয়টা অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় আমরা নোটিশ জারি করেছি যে এরপর থেকে নূন্যতম ১৫ দিনের আগে জমা দিলে সেটা আর গৃহীত হবে না।
আপনার মতামত লিখুন :