জাবিপ্রবি রেজিস্ট্রার ও অর্থ পরিচালককে মবের মুখে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানোর অভিযোগ

ইয়াসির আরাফাত , জাবিপ্রবি সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ২৩ মে, ২০২৬, ১২:৪০ পিএম

জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবিপ্রবি) রেজিস্ট্রার ও অর্থ পরিচালকের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ প্রয়োগ করে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একদল শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি, অবরুদ্ধ রাখা, হেনস্তা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো গুরুতর অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। বৃহস্পতিবার (২১ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে এ ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারী প্রশাসনিক ভবনে রেজিস্ট্রারের কক্ষে প্রবেশ করে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন। প্রায় তিন ঘণ্টার বেশি সময় রেজিস্ট্রারকে সেখানে অবরুদ্ধ রাখা হয়। একপর্যায়ে তাকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তাকে কক্ষ থেকে বের করে প্রশাসনিক ভবন ত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। এ সময় সংবাদ সংগ্রহে থাকা সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে অভিযুক্তরা সরে যান। এসময় রেজিস্ট্রারের হাতে আঘাতের চিহ্নও দেখা যায়।

একই দিনে অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচালকের কক্ষেও অনুরূপ ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, তাকে অপমান-অপদস্থ করে আগে থেকে প্রস্তুত করা পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়।

ঘটনার বিষয়ে জাবিপ্রবির রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ নূর হোসেন চৌধুরী বলেন, “কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারী দীর্ঘ সময় আমাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেন। তারা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও শারীরিক হেনস্তা করেছেন। আমি স্পষ্টভাবে বলেছি, কোনো অভিযোগ থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে চাপ প্রয়োগ করে সই আদায় করে।” তিনি দাবি করেন, নিয়মবহির্ভূত সুবিধা না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে।

অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আসলামও একই ধরনের অভিযোগ করে বলেন, “তারা দলবল নিয়ে এসে আমাকে ভয়ভীতি দেখায় এবং অপমান করে। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, মানসম্মানের ভয়ে আমাকে তাদের প্রস্তুত করা কাগজে সই করতে হয়েছে।”

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অভিযুক্তদের অনেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে অতীতে আওয়ামীলীগের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনের বিরোধীতা, শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়নের পক্ষে অবস্থান এবং বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগে অভিযুক্ত যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন হিসাববিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ড. সৈয়দ নাজমুল হুদা, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মাহমুদুল আলম (শুভ), সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ হাসান, প্রভাষক মো. সাইদুর রহমান৷ সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. এ.এইচ.এম মাহবুবুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক ড. মো. আল মামুন সরকার, প্রভাষক হোসাইন মাহমুদ (আপেল) ও প্রভাষক ইমরুল কবির ৷ এছাড়াও অর্থ ও হিসাব বিভাগের সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. খাইরুল ইসলাম ও কম্পিউটার অপারেটর মালিহা আক্তার মালা'সহ আরও কয়েকজন ৷  

এদিকে, জাবিপ্রবি শাখা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক (বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী) কাওসার আহমেদ স্বাধীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মন্তব্য নিয়েও ক্যাম্পাসে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সেখানে তিনি রেজিস্ট্রারকে উদ্দেশ করে হুমকিসূচক ভাষায় মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একাংশ জানান, নিজেদের বিরুদ্ধে থাকা পূর্বের অভিযোগ ও অনিয়ম আড়াল করতেই একটি গোষ্ঠী সংঘবদ্ধ হয়ে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে নতুন প্রশাসনের কাছে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।

তবে অভিযুক্ত শিক্ষকরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। হিসাববিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক ড. সৈয়দ নাজমুল হুদা বলেন, “এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমরা কেবল দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা ও শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির বিষয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম। রেজিস্ট্রার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন।”

সিএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মাহমুদুল আলম শুভও অভিযোগ নাকচ করে বলেন, “রেজিস্ট্রার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। আমি সেখানে শুধু আইনি বিষয়ে কথা বলেছি।” অন্যদিকে, অভিযুক্তদের কেউ কেউ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার বিষয়টিও অস্বীকার করেছেন।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ আমির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগ নিষ্পত্তির নিজস্ব বিধি রয়েছে। লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো ধরনের মব সৃষ্টি বা ব্যক্তিগত হেনস্তার সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

 

Link copied!