কোটি টাকার সম্পত্তি দখলের লোভে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দিল্লিতে এসে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের তিন দিনের মধ্যেই রহস্য উদ্ঘাটন করেছে দিল্লি পুলিশ। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান থেকে এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে থাকা নাবালক সন্তানকেও হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
গত ৩ জুন পূর্ব দিল্লির বসুন্ধরা এনক্লেভের ‘সত্যম অ্যাপার্টমেন্টস’-এর একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় দিল্লির শিবাজি কলেজের সহকারী অধ্যাপক দেবস্মিতা পালের রক্তাক্ত মরদেহ। ঘটনার পরপরই দিল্লি পুলিশের একাধিক দল চারটি রাজ্যে অভিযান শুরু করে। প্রযুক্তিগত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা নজরদারির সহায়তায় শেষ পর্যন্ত বর্ধমান থেকে রামপ্রসাদ দাস ও বনশ্রী দাস নামের এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, দেবস্মিতার সঙ্গে পূর্বপরিচয়ের সুযোগ নিয়েই পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা দিল্লিতে আসে। ২০১৭ সালে বিয়ের পর ২০২২ সালে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর দেবস্মিতা ওই ফ্ল্যাটে একাই বসবাস করছিলেন। তার স্বামী বর্তমানে বেঙ্গালুরুতে থাকেন।
ঘটনার দিন সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখে মাস্ক পরা এক দম্পতি তাদের নাবালক সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে একটি ব্যক্তিগত ক্যাবে করে আবাসনে প্রবেশ করে। নিরাপত্তাকর্মীদের সন্দেহ এড়াতেই সন্তানকে সঙ্গে আনা হয়েছিল বলে ধারণা পুলিশের। তারা লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি বেয়ে ষষ্ঠ তলায় উঠে দেবস্মিতার ফ্ল্যাটে পৌঁছায়। পরিচিত হওয়ায় সহজেই ফ্ল্যাটে প্রবেশের সুযোগ পায় তারা।
তদন্তে জানা গেছে, ফ্ল্যাটে প্রবেশের পর নিজেদের সঙ্গে আনা ধারালো অস্ত্র দিয়ে দেবস্মিতাকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে তারা পোশাক পরিবর্তন করে ফ্ল্যাটের বাইরে তালা লাগিয়ে নিচে নেমে আসে এবং অপেক্ষমাণ ক্যাবে করে পালিয়ে যায়।
পরদিন দেবস্মিতার বোন দেবযাতী পুলিশকে জানান, তার বোনের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে। তার মাথায় গভীর আঘাতের চিহ্ন এবং হাতের কবজির রগ কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়। তবে ফ্ল্যাট থেকে কোনো মূল্যবান সামগ্রী, নগদ অর্থ বা গহনা খোয়া না যাওয়ায় শুরু থেকেই পুলিশ এটিকে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে।
তদন্তের অংশ হিসেবে আবাসনে যাতায়াতকারী প্রায় ২০০ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেখান থেকে ১৩ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে পুলিশ। একই সঙ্গে ঘটনার দিন ব্যবহৃত ক্যাবের চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রাইড ডেটা ও জিপিএস তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, যাত্রীরা পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের দিকে রওনা হয়েছিল।
এরপর দিল্লি পুলিশের সাতটি দল চারটি রাজ্যে অভিযান চালিয়ে শত শত মানুষের সঙ্গে কথা বলে। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর বর্ধমানে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তাদের দিল্লিতে এনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ট্রানজিট রিমান্ডের প্রক্রিয়া চলছে।
পুলিশের দাবি, হত্যার পেছনে রয়েছে দেবস্মিতা পালের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিপুল সম্পত্তি। বর্ধমানে তার মাতুলালয়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী ছিলেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া দাস দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে ওই সম্পত্তির একটি বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করছিলেন এবং জালিয়াতির মাধ্যমে সেটি নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, কোটি টাকার ওই সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই হত্যার ছক কষা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দিল্লিতে এসে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড ঘটায় অভিযুক্তরা। এখন তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার আরও বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।
আপনার মতামত লিখুন :