সন্তান আসার আগেই বদলে যায় বাবার শরীর ও মন

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২১ জুন, ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম

আপনার সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই আপনার ভেতরে শুরু হয়ে যেতে পারে এক গভীর জৈবিক পরিবর্তন। এতদিন ধারণা ছিল, মাতৃত্বই নারীর শরীর ও মস্তিষ্কে সবচেয়ে বড় রূপান্তর আনে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, পিতৃত্বও একজন পুরুষকে ভেতর থেকে বদলে দেয়। হরমোনের পরিবর্তন, মস্তিষ্কের পুনর্গঠন এবং আবেগের নতুন বিকাশ একজন পুরুষকে সন্তানের যত্নশীল অভিভাবক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন পুরুষ যখন বাবা হওয়ার পথে এগিয়ে যান, তখন তার শরীরে টেস্টোস্টেরন, অক্সিটোসিন, ভ্যাসোপ্রেসিন ও প্রোল্যাকটিনসহ বিভিন্ন হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন দেখা যায়। এসব পরিবর্তন কেবল সন্তানের জন্মের পর নয়, অনেক ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার সময় থেকেই শুরু হয়। ফলে একজন পুরুষ ধীরে ধীরে সন্তানকে গ্রহণ ও লালন-পালনের জন্য মানসিক এবং শারীরিকভাবে প্রস্তুত হতে থাকেন।

পিতৃত্ব নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, যেসব পুরুষ সন্তানের যত্নে বেশি সময় দেন, তাদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি হারে কমে যায়। ফিলিপাইনে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাবা হওয়ার পর পুরুষদের টেস্টোস্টেরন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। বিশেষ করে যারা সন্তানের পরিচর্যায় সক্রিয় থাকেন এবং সন্তানদের সঙ্গে বেশি সময় কাটান, তাদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট।

গবেষকদের মতে, টেস্টোস্টেরনের এই হ্রাস কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটি পুরুষদের আরও সংবেদনশীল, সতর্ক ও যত্নশীল করে তোলে। শিশুর কান্না কিংবা প্রয়োজনের প্রতি দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রবণতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, অক্সিটোসিন বা তথাকথিত ‘ভালোবাসার হরমোন’-এর মাত্রাও বাবাদের মধ্যে বৃদ্ধি পায়। এই হরমোন মা ও শিশুর বন্ধনের ক্ষেত্রে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাবার ক্ষেত্রেও সন্তানের প্রতি আবেগ ও সংযুক্তি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তানকে কোলে নেওয়া, খেলাধুলা করা কিংবা তার সঙ্গে সময় কাটানোর ফলে বাবাদের শরীরে অক্সিটোসিনের মাত্রা বাড়ে। ফলে তারা সন্তানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।

আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রোল্যাকটিন নামের যে হরমোনকে দীর্ঘদিন ধরে মাতৃত্ব ও দুগ্ধক্ষরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, সেটিও বাবাদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব হবু বাবা অনাগত সন্তানের সঙ্গে গভীর মানসিক সংযোগ অনুভব করেন, তাদের শরীরে প্রোল্যাকটিনের মাত্রা বেশি থাকে। ভবিষ্যতে সন্তানের যত্নে কতটা সম্পৃক্ত হবেন, তারও ইঙ্গিত দিতে পারে এই হরমোন।

হরমোনের পাশাপাশি পরিবর্তন ঘটে মস্তিষ্কেও। নতুন বাবাদের ওপর পরিচালিত একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান জন্মের আগে ও পরে তাদের মস্তিষ্কে কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটে। বিজ্ঞানীরা এই পরিবর্তনকে অনেকটা কৈশোরকালীন মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গে তুলনা করেছেন। নতুন দায়িত্ব, নতুন আবেগ এবং নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে মস্তিষ্ক নিজেকে পুনর্গঠিত করে।

গবেষকদের মতে, একজন বাবা সন্তানের যত্নে যত বেশি যুক্ত থাকেন, তার মস্তিষ্ক ও শরীরে পরিবর্তনও তত বেশি গভীর হয়। অর্থাৎ পিতৃত্ব কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি শক্তিশালী জৈবিক প্রক্রিয়াও। মানুষের বিবর্তনের ধারায় সন্তান লালন-পালনে পুরুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলেই এই সক্ষমতা আজও মানুষের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো পরিবার ও সমাজের নীতিনির্ধারণে নতুনভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত। পিতৃত্বকালীন ছুটি, গর্ভাবস্থার সময় বাবাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সন্তান জন্মের পর তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ানো হলে পরিবার আরও শক্তিশালী হতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব পরিবারে বাবারা সন্তানের লালন-পালনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন, সেখানে মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়। এমনকি সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি যত্নশীল বাবাদের সন্তানদের হৃদ্‌স্বাস্থ্যও তুলনামূলকভাবে উন্নত হয়।

 

সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, পিতৃত্ব একজন পুরুষকে শুধু সামাজিক পরিচয়ে বাবা বানায় না; বরং তার শরীর, মস্তিষ্ক ও আবেগের গভীরে এক নতুন রূপান্তরের সূচনা করে। সন্তান জন্মের আগেই শুরু হওয়া এই পরিবর্তনই একজন পুরুষকে ধীরে ধীরে যত্নশীল, সুরক্ষামূলক এবং দায়িত্বশীল অভিভাবকে পরিণত করে।

Link copied!