চার মাসেই ১ লাখ কোটি টাকা ঋণ বেড়েছে, সংসদে সরকারের সমালোচনায় আখতার হোসেন

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬, ০৬:০০ পিএম

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র চার মাসের মধ্যে দেশের মোট ঋণ প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বৃদ্ধি করেছে বলে দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা, যা বর্তমানে বেড়ে ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

আখতার হোসেন বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাংলাদেশ থেকে ২৪০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যার পরিমাণ দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকার সমান। তাঁর মতে, বিপুল অঙ্কের এই অর্থ পাচারের ফলে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

খেলাপি ঋণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশের বিপুল অর্থ খেলাপি ঋণ হিসেবে আটকে আছে। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, ঋণসংক্রান্ত মামলার কারণে বর্তমান সংসদের দুই সদস্য এখনো শপথ নিতে পারেননি। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, খেলাপি ঋণের সংকট দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করে তুলেছে।

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে আখতার হোসেন বলেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে, অথচ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি চার শতাংশের সামান্য বেশি। এমন পরিস্থিতিতেই নতুন বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে।

সরকারের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দাবির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাজেট ঘোষণার পর নয়, বরং তার আগেই গত তিন মাসে দুই দফা বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেই প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও পড়েছে। তাঁর মতে, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ধারা শুরু হয়েছে।

বিদেশি ঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ পেতে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি ও ব্যবস্থাপনা আলাদা করার উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অধ্যাদেশের মাধ্যমে গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার তা কার্যকর না করে বাতিল করেছে। তাঁর মতে, সময়মতো এসব সংস্কার বাস্তবায়ন করা হলে বিদেশি ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব হতো।

ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অস্থিরতা বিরাজ করছে। একাধিক দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা হলেও অতীতে অর্থ লুটপাট ও পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত মালিকদের আবারও ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, ব্যাংক পুনর্গঠন আইনের একটি ধারায় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ফেরত দিলে আগের মালিকদের পুনরায় মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। যারা ব্যাংককে দুর্বল করেছে, তাদের পুনরায় মালিকানা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে আখতার হোসেন বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বাজেট ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

তিনি বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। গত অর্থবছরে সংস্থাটি মাত্র ৩ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে পেরেছিল এবং চলতি অর্থবছরেও আদায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার আশপাশে রয়েছে। এমন অবস্থায় ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আখতার হোসেনের আশঙ্কা, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে এবং প্রস্তাবিত বাজেট শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের ঘাটতির বাজেটে পরিণত হতে পারে।

Advertisement

Link copied!