বেনজীরকে ফেরানো কতটা সম্ভব

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৪ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম

বেনজীরকে ফেরানো কতটা সম্ভব

ফাইল ফটো

দুবাইয়ে শর্তসাপেক্ষ জামিনে মুক্তি পাওয়ায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। তার পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে থাকলেও বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ এখনো দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।

দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়ার পর বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার আশা প্রকাশ করেছিল সরকার। প্রয়োজনীয় নথিও নির্ধারিত সময়ের আগেই ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। তবে শর্তসাপেক্ষ জামিনে মুক্তি পাওয়ায় সেই প্রক্রিয়া এখন আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে বেনজীর কারাগারের বাইরে থাকলেও পুরোপুরি স্বাধীন নন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তার পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে রয়েছে। আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগ করতে পারবেন না। তবে এই বিধিনিষেধ তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার নিশ্চয়তা দেয় না।

এখন সরকারের সামনে দুটি আলাদা আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। একটি হলো তার জামিন বাতিলের চেষ্টা। অন্যটি প্রত্যর্পণ নিশ্চিত করা। জামিন বাতিল হলেও প্রত্যর্পণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে না। এজন্য ইউএই আদালতে অভিযোগ, গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং অন্যান্য প্রমাণ গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

এ উদ্দেশ্যে সরকার ইউএইতে একটি স্থানীয় আইন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটিকে বেনজীরের জামিন বাতিলের আবেদন অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কোন প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, কী শর্তে চুক্তি হয়েছে এবং এর ব্যয় কত হবে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বেনজীরের জামিনের খবর তিনি প্রথমে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানতে পারেন। পরে স্বরাষ্ট্র সচিবকে ইউএইতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করে জামিন আদেশের প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহের নির্দেশ দেন।

তিনি বলেন, কয়েক দিন আগেই এ বিষয়ে আইন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে। তারা জামিন বাতিলের জন্য আদালতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। সরকারের আশা, দ্রুত জামিন বাতিল করে বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

তবে এখনো জামিন আদেশের প্রত্যয়িত কপি হাতে না পাওয়ায় আদালত কোন যুক্তিতে তাকে মুক্তি দিয়েছে, তা জানা যায়নি। ফলে জামিন বাতিলের জন্য কী ধরনের আইনি যুক্তি উপস্থাপন করা হবে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।

গত ১২ জুন দুবাই পুলিশ বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করে। একই দিন ইউএইর ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো বাংলাদেশকে বিষয়টি জানায়। বাংলাদেশের আবেদনের ভিত্তিতে ইন্টারপোল ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করেছিল। ঢাকার আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার তথ্যের ভিত্তিতেই ওই নোটিশ জারি হয়।

দুদকের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, বেনজীর আহমেদ প্রায় ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন এবং পরিচিত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ প্রায় ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। এছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগও রয়েছে। এ মামলার বিচার বর্তমানে চলমান।

তার বিরুদ্ধে পাসপোর্ট জালিয়াতির পৃথক মামলাও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে থাকাকালে তিনি পাসপোর্টের আবেদনে নিজেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে উল্লেখ করেন এবং প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই একাধিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেন।

গ্রেফতারের পর ইউএই কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে ৩০ দিনের সময় দিয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার মাত্র তিন দিনের মধ্যেই প্রয়োজনীয় নথি পাঠিয়ে দেয়।

পরে ২৭ জুলাই দুবাইয়ের একটি আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে তাকে শর্তসাপেক্ষ জামিন দেন। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ৩০ জুলাই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তার পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে থাকবে এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি ইউএইর বাইরে যেতে পারবেন না। তবে জামিনের অন্য কোনো শর্ত রয়েছে কি না, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

বেনজীরের মুক্তির খবর দুদকও প্রথমে গণমাধ্যম থেকেই জানতে পারে। দুদকের মহাপরিচালক মীর মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন শিবলী বলেন, প্রয়োজনীয় সব নথি ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং সেখান থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইউএইতে পাঠানো হয়েছে। তবে আদালত কী কারণে জামিন দিয়েছেন, তা না জেনে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জামিন বাতিল হলেও বেনজীরকে দেশে ফেরানো নিশ্চিত হবে না। প্রত্যর্পণের বিষয়ে ইউএই আদালতকে সন্তুষ্ট করতে বাংলাদেশকে অভিযোগ ও প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে বেনজীরের আইনজীবীরা প্রত্যর্পণের বিরোধিতা করতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে উচ্চ আদালতেও আপিল করতে পারবেন। ফলে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কত সময় লাগবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে সরকার এখনো আশাবাদী যে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে।

সিয়াম সরিষা
Link copied!