সীমান্ত পেরিয়ে আসছে মৃত্যু, নেশায় ডুবছে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট, ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম

সীমান্ত পেরিয়ে আসছে মৃত্যু, নেশায় ডুবছে বাংলাদেশ

ফাইল ফটো

আমিরুল ইসলাম : সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকছে ইয়াবা-আইসের স্রোত, মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮২ লাখ; তরুণদের ঘিরে বিস্তৃত হচ্ছে ভয়াবহ সামাজিক সংকট। বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম, সীমান্ত থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সর্বত্র যেন অদৃশ্য জালের মতো ছড়িয়ে পড়ছে মাদক। কোনো এলাকায় ইয়াবা, কোথাও গাঁজা ও হেরোইন, আবার উচ্চবিত্তের পার্টিতে ছড়িয়ে পড়ছে ক্রিস্টাল মেথ বা ‘আইস’, এলএসডি ও নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় প্রতিদিনের অভিযান, বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ এবং কঠোর আইন প্রণয়নের পরও থামছে না এই আগ্রাসন। বরং ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের ঘটনাপ্রবাহ বলছে, মাদক এখন শুধু অপরাধের সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য এক গভীর জনস্বাস্থ্য, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার সংকটে পরিণত হয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতেই প্রকাশিত জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণা দেশের মাদক পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র সামনে আনে। গবেষণার হিসাবে, বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ এক বা একাধিক অবৈধ মাদক ব্যবহার করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তাদের বড় অংশই তরুণ। ব্যবহারকারীদের ৩৩ শতাংশ ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে প্রথম মাদক গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ মাদকের ফাঁদে পা দেওয়া অধিকাংশ মানুষের বয়স ২৫ বছরের নিচে।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, দেশে আনুমানিক ৬১ লাখ মানুষ গাঁজা, ২৩ লাখ মানুষ ইয়াবা বা মেথামফেটামিন এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষ অ্যালকোহল ব্যবহার করেন। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করেন প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ, যাদের এইচআইভি, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাদের এলাকায় মাদক সহজেই পাওয়া যায়। অথচ চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন মাত্র ১৩ শতাংশ।

এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অসংখ্য ভেঙে যাওয়া পরিবার, ঝরে পড়া শিক্ষার্থী, কর্মক্ষমতা হারানো তরুণ এবং অপরাধের দিকে ধাবিত হওয়া একটি জনগোষ্ঠী। মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ নিয়মিতই সামনে আসছে। বহু পরিবার সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে আসক্ত সদস্যের বিষয়টি গোপন রাখে। ফলে চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই আসক্তি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

বাংলাদেশে মাদকের বড় অংশ উৎপাদিত হয় না; আসে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য উল্লেখ করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ২৯টি সীমান্ত জেলার অন্তত ১৬২টি রুট দিয়ে ইয়াবা, আইস, হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা, ট্যাপেন্টাডল ও অন্যান্য মাদক প্রবেশ করছে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ও আইস এবং পশ্চিম ও উত্তর সীমান্ত দিয়ে ফেনসিডিল, হেরোইন ও বিভিন্ন নিষিদ্ধ ওষুধ প্রবেশ করছে।

বিশেষ করে কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়া, নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন উপকূলীয় রুট মাদক পাচারের অন্যতম প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে। মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ রাখাইন অঞ্চলে খাদ্য, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রীর বিনিময়ে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথ দেওয়ার একটি নতুন ‘নারকো-কারেন্সি’ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার তথ্যও সামনে এসেছে। মাছ ধরার নৌকা ও ছোট ট্রলারে বাংলাদেশ থেকে পণ্য নিয়ে গিয়ে ফেরার পথে মাছ, বরফ ও নৌকার গোপন অংশে মাদক লুকিয়ে আনা হচ্ছে।

২৩ জুলাই নাফ নদীতে অভিযান চালিয়ে এক লাখ ১০ হাজার ইয়াবা জব্দ করে বিজিবি। প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা মূল্যের ওই চালানের সঙ্গে দুই সন্দেহভাজন পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, নৌকাটি সরাসরি মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করেছিল।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শুধু জানুয়ারি মাসেই বিজিবি দেশের সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১২ লাখ ৩২ হাজারের বেশি ইয়াবা, প্রায় দুই টন গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, বিদেশি মদ এবং বিভিন্ন ধরনের মাদকজাতীয় ট্যাবলেট ও ইনজেকশন জব্দ করে। ওই মাসে মাদক পাচার ও চোরাচালানে জড়িত অভিযোগে ১৭২ জনকে আটক করা হয়।

ফেব্রুয়ারিতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। বিজিবি এক মাসে ১৭ লাখের বেশি ইয়াবা, ১ কেজি ২৪৪ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, ২ কেজির বেশি হেরোইন, ২৫০ গ্রাম কোকেন, প্রায় এক হাজার টন গাঁজা এবং বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল, বিদেশি মদ ও নিষিদ্ধ ট্যাবলেট জব্দ করে। এসব অভিযানে মাদক পাচারসহ চোরাচালানের অভিযোগে ১৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আগের বছরের চিত্রও একইভাবে ভয়াবহ। বিজিবির হিসাবে, ২০২৫ সালে সীমান্ত অভিযানগুলোতে ১৪ কোটি ৭০ লাখের বেশি ইয়াবা ট্যাবলেটসহ বিপুল পরিমাণ আইস, হেরোইন, কোকেন, এলএসডি, গাঁজা, ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদক জব্দ করা হয়েছিল। মাদক ও চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় ২ হাজার ৩৩৪ জনকে। এত বিপুল জব্দের পরও ২০২৬ সালে সরবরাহ অব্যাহত থাকা থেকে বোঝা যায়, আটক চালানগুলো সম্ভবত মোট পাচারের কেবল একটি অংশ।

জুলাইয়ের শেষ দিকে কুমিল্লা ও সাতক্ষীরা সীমান্তে গত তিন বছরে জব্দ করা ৮৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা মূল্যের মাদক ধ্বংস করে বিজিবি। ধ্বংস করা মাদকের মধ্যে ছিল ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল, এলএসডি এবং ২ দশমিক ৪ কেজি ক্রিস্টাল মেথ। একদিকে পুরোনো মাদক ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্ত দিয়ে আসছে নতুন চালান—এই চক্রই বাংলাদেশের মাদকবিরোধী অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আঞ্চলিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সিনথেটিক মাদকের উৎপাদন ও পাচার রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরেই মেথামফেটামিন উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং সেখানকার সংঘাত ও দুর্বল সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক অপরাধী নেটওয়ার্ককে আরও সক্রিয় করেছে। ইয়াবা পাচারের পুরোনো রুটগুলো দিয়েই এখন অধিক বিশুদ্ধ ও বেশি ক্ষতিকর ক্রিস্টাল মেথ বাংলাদেশে ঢুকছে।

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অভিযান চালিয়ে দেশটির কর্তৃপক্ষ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মাদক উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর সন্ধান পাওয়ার দাবি করে। সেখানে হেরোইন, মেথামফেটামিন ও ক্রিস্টাল মেথ তৈরির বিপুল সরঞ্জাম ও উপকরণ পাওয়া যায়। ওই অঞ্চল থেকে বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে মাদক পাচারের রুট রয়েছে বলে মিয়ানমারের কর্মকর্তারা জানান।

মাদকের ধরনও দ্রুত বদলাচ্ছে। একসময় গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের ব্যবহার বেশি থাকলেও বর্তমানে ইয়াবার পাশাপাশি আইস, এলএসডি, কেটামিন, ট্যাপেন্টাডল, ঘুমের ওষুধ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক মিশ্রিত মাদক ছড়িয়ে পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ, অনলাইন গ্রুপ ও কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে অর্ডার নেওয়া এবং মাদক পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও বেড়েছে।

এই বাস্তবতায় জুলাই মাসে জাতীয় সংসদে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী পাস করা হয়। নতুন আইনে অনলাইনে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ বা সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

তবে শুধু কঠোর শাস্তি দিয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশে মাদকসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ছয় লাখের বেশি এবং অনেক মামলা নিষ্পত্তিতে ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত সময় লাগছে। বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, অধিকাংশ অভিযানে মাদক ব্যবহারকারী, বাহক ও খুচরা বিক্রেতারা ধরা পড়লেও আড়ালে থেকে যাচ্ছেন অর্থদাতা, গডফাদার, সীমান্তের মূল সমন্বয়কারী এবং তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকেরা। অর্থের প্রবাহ, অবৈধ সম্পদ ও পাচার নেটওয়ার্ক অনুসন্ধান না করলে শুধু দ্রুত বিচারেও মাদকের মূল শিকড় উপড়ে ফেলা কঠিন হবে।

মাদকাসক্তিকে কেবল অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বেকারত্ব, সহপাঠীদের চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং হতাশা তরুণদের মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ব্যবহারকারীদের ৬৮ শতাংশ পরিবার ও সমাজে বৈষম্য এবং অপমানের শিকার হয়েছেন। অথচ পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং ও কর্মসংস্থান সহায়তাকে তারা মাদক ছাড়ার প্রধান প্রয়োজন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সরকার ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু ৮২ লাখ ব্যবহারকারীর বিপরীতে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা এখনো অপ্রতুল। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, কাউন্সেলর, ডিটক্সিফিকেশন সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের সুযোগ সীমিত।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান প্রয়োজন, কিন্তু মাদকের চাহিদা কমানো ছাড়া শুধু সরবরাহ বন্ধের চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। পরিবারে সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত কাউন্সেলিং, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, কর্মসংস্থান এবং সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক কারবারের অর্থদাতা ও গডফাদারদের সম্পদ জব্দ, অর্থপাচারের তদন্ত, সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি।

বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রতিটি জব্দ করা চালান একটি সাফল্য হলেও একই সঙ্গে তা সীমান্ত পেরিয়ে আসা মাদকের বিশাল প্রবাহের প্রমাণ। কোটি কোটি ইয়াবা জব্দ, শত শত কোটি টাকার মাদক ধ্বংস এবং হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তারের পরও যখন ৮২ লাখ মানুষ মাদক ব্যবহার করেন, তখন স্পষ্ট হয়—সমস্যাটি শুধু কয়েকজন কারবারি বা কয়েকটি সীমান্ত রুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

মাদক এখন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, পরিবার, শিক্ষা, অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে একই সঙ্গে গ্রাস করছে। এই ভয়ংকর নেশা থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সমাজের সমন্বিত যুদ্ধ। অন্যথায় মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যেতে পারে দেশের সবচেয়ে মূল্যবান শক্তি—তারুণ্য।

সিয়াম সরিষা
Link copied!