“খাদ্যে যারা ভেজাল দেয়, তারা আসলে খুনি”— কথাটি নিছক আবেগপ্রসূত কোনো উক্তি নয়, বরং বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। খাদ্যে ভেজাল দেওয়া মানে ধীরে ধীরে, সুকৌশলে একটি জাতির ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করা। খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার এবং বেঁচে থাকার প্রধান শর্ত। কিন্তু যে খাদ্য মানুষের জীবন রক্ষার কথা, আজ মুনাফালোভী একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে সেটিই পরিণত হয়েছে মরণব্যাধির বাহনে।
তিল তিল করে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া এই অপরাধ কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি একটি সুপরিকল্পিত ও নীরব হত্যাকাণ্ড। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ক্রমবর্ধমান ব্যবসা অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিরূপণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে। এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের নৈতিকতা, ইসলামী মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় আইনের সমন্বয়ে গড়ে তুলতে হবে একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: একটি ভয়াবহ চিত্র
দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গুগলে অনুসন্ধান করলেই খাদ্যে ভেজাল সংক্রান্ত অসংখ্য সংবাদ সামনে আসে। দেশে কী ধরনের ভেজালের ঘটনা ঘটছে, তার একটি ক্ষুদ্র তালিকাই যথেষ্ট আতঙ্কজনক।
আম-কলায় কার্বাইড, ফল ও সবজিতে ফরমালিন, মাছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, সয়াবিন তেলে পাম অয়েল, দুধে ডিটারজেন্ট, ঘি ও মধুতে চিনির সিরাপ, কেক ও আইসক্রিমে টেক্সটাইল রং, এমনকি মসলা তৈরিতেও ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়।
এই ভেজালের পরিণতি কী? উত্তর একটাই— ধীর মৃত্যু।
নৈতিকতা ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে ব্যবসায়ে সততা এবং ওজন ও পরিমাপে ন্যায়পরায়ণতার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মুতাফফিফিনে পরিমাপে কম দেওয়াকারীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার বাজারে এক খাদ্য বিক্রেতার স্তূপের ভেতরে হাত দিয়ে দেখেন, নিচের অংশ ভেজা অথচ ওপরের অংশ শুকনো। তখন তিনি সতর্ক করে বলেন, “যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম)
ইসলামী ফিকহবিদদের মতে, খাদ্যে ভেজাল দেওয়া প্রতারণা, মিথ্যাচার এবং মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার মতো গুরুতর অপরাধ। যেহেতু এর ফলে মানুষ অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে পারে, তাই অনেক আলেম এটিকে পরোক্ষ হত্যার শামিল বলে অভিহিত করেছেন।
নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি একই। মুনাফার লোভে মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা কোনো ধর্ম, দর্শন বা মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: রোগ, হাসপাতাল ও চিকিৎসা সংকট
নিরাপদ খাদ্যের অভাবে বাংলাদেশে কিডনি রোগ, লিভারের জটিলতা, ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন।
ফরমালিনযুক্ত মাছ ও ফল, কার্বাইড দিয়ে পাকানো ফল, ক্ষতিকর রং মেশানো মিষ্টি ও মসলা এবং অতিরিক্ত রাসায়নিকযুক্ত খাদ্য দীর্ঘমেয়াদে শরীরে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এর ফলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
একদিকে ভেজাল খাদ্য মানুষকে অসুস্থ করছে, অন্যদিকে সীমিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সেই চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। অনেক মানুষের জীবন হয়ে উঠছে হাসপাতালনির্ভর।
বিদেশে চিকিৎসা: বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষয় ও দারিদ্র্য
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটের কারণে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন।
চিকিৎসা খাতে বিদেশে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এই অর্থ দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহার করা গেলে জনগণের জন্য আরও উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।
ভেজাল খাদ্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হওয়া শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আইনের প্রয়োগ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার
খাদ্যে ভেজাল রোধে বাংলাদেশে বিদ্যমান প্রধান আইন হলো নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩। এই আইনের অধীনে ২০১৫ সালে গঠন করা হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (BFSA)।
আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে এর কার্যকর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। অধিকাংশ সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা, কারখানা সিলগালা বা সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন পর একই অপরাধীরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
বিচার প্রক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি:
খাদ্য অপরাধের জন্য পৃথক দ্রুত বিচার ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন, যাতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করা যায়। একই অপরাধ বারবার করলে ফৌজদারি মামলা ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
শাস্তির কঠোর প্রয়োগ:
শুধু জরিমানা নয়, খাদ্যে ভেজালকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা:
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে আরও জনবল, আধুনিক পরীক্ষাগার এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা:
ভেজাল চক্রের পেছনে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ না হলে কোনো আইনই কার্যকর হবে না।
ব্যক্তিগত উপলব্ধি ও সমাজের প্রত্যাশা
আমরা যখন বিদেশে যাই, তখন অনেক সময় নিশ্চিন্তে খাবার গ্রহণ করি, কারণ সেখানে খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ নিজের দেশে বাজারে গিয়ে প্রতিটি পণ্য কেনার আগে সন্দেহ তৈরি হয়— এই দুধ খাঁটি তো? এই মসলায় ক্ষতিকর রং মেশানো নেই তো?
এই অনিশ্চয়তা কোনো জাতির জন্য স্বাভাবিক হতে পারে না। নাগরিকের পাতে নিরাপদ খাবার তুলে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
একজন নাগরিক হিসেবে আমার সবচেয়ে বেদনাদায়ক অনুভূতি হলো, বিদেশে রাস্তার খাবার খেলেও যেখানে নিরাপত্তার অনুভূতি থাকে, সেখানে নিজের দেশে নিজের পরিবারের রান্না করা খাবার নিয়েও কখনো কখনো সন্দেহ তৈরি হয়। এটি একটি ভয়াবহ বাস্তবতা।
রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে উন্নয়নের অন্যান্য অর্জনও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কার্যকর ব্যবস্থা
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাদ্য উৎপাদন থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত কঠোর নজরদারি থাকে। খাদ্যে ভেজাল প্রমাণিত হলে বড় অঙ্কের জরিমানা, ব্যবসা বন্ধ এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
জাপানে খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সামান্য অনিয়মও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
চীনেও অতীতে বড় ধরনের খাদ্য কেলেঙ্কারির পর কঠোর আইন প্রয়োগ করা হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
সমাজ হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা
- একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা স্পষ্ট:
- খাদ্য অপরাধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
- প্রথমবারের অপরাধ বলে ছাড় দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
- পাঠ্যপুস্তকে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রচার চালাতে হবে।
- ভোক্তাদের সংগঠিত হতে হবে এবং ভেজালের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে হবে।
- প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার শপথ নিতে হবে।
- খাদ্যে ভেজাল কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি জাতির স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব আগ্রাসন।
- যে হাত খাদ্যে বিষ মিশিয়ে মুনাফা অর্জন করে, সেই হাত প্রকৃত অর্থেই হত্যার হাত। রাষ্ট্র, আইন, বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজ একসঙ্গে এগিয়ে এলেই এই নীরব হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব।
- নিরাপদ খাদ্য শুধু একটি অধিকার নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক শর্ত। আর সেই শর্ত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
(লেখক: জননিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অতিরিক্ত আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ [অব.])

আপনার মতামত লিখুন :