অন্তরবর্তিকালীন সরকারের প্রভাবশালীদের রোষানলের শিকারে প্রথমে ক্লোজ পরে বরখাস্ত ড. নাজমুল করিম খান

বিশেষ প্রতিনিধি , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪৭ এএম

অন্তরবর্তিকালীন সরকারের প্রভাবশালীদের রোষানলের শিকারে প্রথমে ক্লোজ পরে বরখাস্ত ড. নাজমুল করিম খান

ফাইল ফটো

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পদোন্নতিবঞ্চিত, নির্যাতিত ও চাকরিচ্যুত হওয়ার পরও নানা প্রভাবশালী মহলের রোষানল থেকে রক্ষা পাননি গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার ডিআইজি ড. মো. নাজমুল করিম খান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অন্তরবর্তীকালীন সরকারের প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তির বিরাগভাজন হয়ে তিনি জিএমপি কমিশনারের পদ থেকে প্রথমে ক্লোজ ও পরে সাময়িক বরখাস্ত হন।

 যদিও পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রশাসনিক কারণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তবে ক্লোজ করার পার দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও তাকে এব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোন কারন দর্শন বা অবহিত করা হয়নি।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ড. নাজমুল করিম খান বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের একজন কর্মকর্তা। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানা গেলেও কর্মজীবনে তিনি একজন পেশাদার, সৎ, দক্ষ ও সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন।

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ বঞ্চনার পর ২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট তিনি চাকরিতে পুনর্বহাল হন। একই বছরের ১২ নভেম্বর গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ২০২৫ সালের ১ মে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন।

পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ড. নাজমুল করিম খানকে ক্লোজ করার পেছনে সরকারি ব্যাখ্যা নেই, কোন বিধি বা আইন মানা হয়নি। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কমিশনার ও অতিরিক্ত কমিশনাররা ঢাকার বাসা থেকে নিয়মিত অফিস করতেন। ড. নাজমুল করিম খানও সরকারি বরাদ্দকৃত বাসা হতে পূর্বসূরিদের মতো একই পদ্ধতিতে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু এতদিন এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন না উঠলেও তার দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় নয় মাস পর বিষয়টি সামনে আসে।

তাদের মতে, গাজীপুরে কমিশনারের জন্য কোনো সরকারি আবাসন না থাকায় ব্যক্তিগতভাবে বাসা ভাড়া নিয়ে পরিবারসহ বসবাস করা নিরাপত্তা ও ব্যয়ের দিক থেকে বাস্তবসম্মত ছিল না, উপরন্তু ঢাকার বাসাটি তার সরকারি বরাদ্দকৃত। একজন পুলিশ কমিশনারের নিরাপত্তা এবং একই ভবনের অন্যান্য বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাচলের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই জিএমপি কমিশনারদের ঢাকায় অবস্থান করার বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তর নীরবে মেনে নিয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. নাজমুল করিম খান গাজীপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশ্ব ইজতেমা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা, মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, যানজট নিরসন, গার্মেন্টস শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা মোকাবিলা, অপরাধ দমন এবং বিভিন্ন সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তিনি সফলতা দেখান।

একাধিক সূত্রের দাবি, তার নেতৃত্বে গত কয়েক মাসে প্রায় দুই হাজার ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার করা হয়। অবৈধ হোটেল ব্যবসা, জুয়া ও মাদকবিরোধী অভিযানে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে জিএমপি।

সম্প্রতি বহুল আলোচিত দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর গাজীপুর স্টাফ রিপোর্টার সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যা মামলার তদন্তেও জিএমপি দ্রুত অগ্রগতি দেখায়। ড. নাজমুল করিম খানের নেতৃত্বে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মাত্র তিন দিনের মধ্যে নয়জন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে মামলাটি দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাচ্ছে।

এছাড়া গাছা থানার অভিযানে একটি ডাকাতচক্রের ছয় সদস্য গ্রেপ্তার, নগদ অর্থ, দেশীয় অস্ত্র ও মোটরসাইকেল উদ্ধার, আলোচিত হানিট্র্যাপ মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ট্রাভেল ব্যাগে আট টুকরা লাশ উদ্ধারের ঘটনার রহস্য উদঘাটনেও জিএমপি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

সূত্র জানায়, ড. নাজমুল করিম খান জাপান থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর ফরেনসিক শাখায় বিশেষ পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০২৩ সালে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল। পরে আদালতের আদেশ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে তিনি চাকরিতে ফিরে আসেন। ডিআইজি পদে পদোন্নতি পেয়ে পুলিশ স্টাফ কলেজে যোগদানের পর তাকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

তবে সম্প্রতি তাকে জিএমপি কমিশনারের দায়িত্ব থেকে ক্লোজ করার ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সিদ্ধান্তের পেছনের প্রকৃত কারণ ও প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করতে প্রয়োজনীয় তদন্ত হলে বিষয়টি নিয়ে বিদ্যমান নানা প্রশ্নেরও উত্তর মিলতে পারে।

সিয়াম সরিষা
Link copied!