বায়তুল্লাহর ছায়ায় এক পবিত্র প্রত্যাবর্তন: উমরাহ: ২০২৬ : মদিনা থেকে মক্কার আত্মিক সফর : ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

ড. মোঃ আশরাফুর রহমান , লেখক

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম

বায়তুল্লাহর ছায়ায় এক পবিত্র প্রত্যাবর্তন: উমরাহ: ২০২৬ : মদিনা থেকে মক্কার আত্মিক সফর : ড. মোঃ আশরাফুর রহমান

ফাইল ফটো

মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ আকাঙ্ক্ষাগুলোর একটি হলো পবিত্র দুই নগরী মক্কা ও মদিনা জিয়ারতের সৌভাগ্য লাভ। মহান সৃষ্টিকর্তার ঘর কাবা শরিফ ও প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্মৃতিধন্য নগরী মদিনা মোনাওয়ারা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ের গভীরে এক চিরস্থায়ী টান সৃষ্টি করে। ঠিক এমনই এক মোহনীয় আকর্ষণ ও আধ্যাত্মিক পিপাসা নিয়েই এক পবিত্র ওমরাহ সফরে মদিনা থেকে মক্কার পথে যাত্রা শুরু হয়েছিল।

মদিনার বিদায় ও মক্কা অভিমুখে যাত্রা

মদিনা শরিফের পবিত্র ভূমি, মসজিদে নববির প্রশান্তিময় সবুজ গম্বুজ এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর রওজা মোবারকের সান্নিধ্য পেছনে ফেলে মক্কার উদ্দেশে রওনা হওয়া এক বিচিত্র অনুভূতির জন্ম দেয়। একদিকে রাসুল (সা.)-এর নগরী ছেড়ে যাওয়ার গভীর বেদনা, অন্যদিকে আল্লাহর ঘর কাবার দিদারের জন্য আকুল প্রতীক্ষা। দ্রুতগামী ট্রেন যখন মরুময় প্রান্তর ভেদ করে এগিয়ে চলছিল, তখন মনে হচ্ছিল প্রতিটি মুহূর্ত যেন আমাকে পার্থিব কোলাহল ও মোহ থেকে মুক্ত করে এক মহিমান্বিত সফরে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

মক্কা রেলস্টেশনে পৌঁছে প্রবাসী আপনজনদের আন্তরিক অভ্যর্থনায় সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর ভাই, আনোয়ার ভাই, তাজুল ইসলাম ভাই ও আবদুর রহমান ভাই-সহ অনেকের হাসিমুখ ও ভালোবাসাময় সহযোগিতা প্রবাসের মাটিতেও আত্মীয়তার পরশ বুলিয়ে দেয়। হোটেলে পার্থিব বোঝা রেখে আমরা আর বিলম্ব করিনি; অন্তরকে সমর্পণের জন্য প্রস্তুত করে মুখে তালবিয়ার ধ্বনি নিয়ে রওনা হলাম পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে।

ইতিহাস ও তাওহিদের কেন্দ্র পবিত্র মক্কা

মক্কা কোনো সাধারণ শহর নয়; এটি মানবজাতির আধ্যাত্মিক চেতনার প্রাচীনতম কেন্দ্র এবং তাওহিদের আলোকবর্তিকা। পবিত্র কোরআনে কাবাকে মানবজাতির জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রথম ইবাদতগৃহ এবং বরকতময় ও বিশ্বজগতের জন্য পথনির্দেশক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে (সুরা আলে-ইমরান, ৩:৯৬)। এই নগরীতেই মহানবী (সা.) জন্মগ্রহণ করেন, হেরা গুহায় প্রথম ওহি লাভ করেন এবং দীর্ঘ তেরো বছর কুরাইশদের নির্মম নির্যাতন সত্ত্বেও এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে মানুষকে আহ্বান করেন।

কুরাইশদের চরম বিরোধিতা ও প্রাণনাশের ষড়যন্ত্রের মুখে ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে নবীজি (সা.) মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হন। হিজরতের পথে সওর গুহায় আশ্রয় নেওয়ার ঐতিহাসিক ঘটনায় আল্লাহর অপার সাহায্যের কথা কোরআন স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে রাসুল (সা.) তাঁর সঙ্গী আবু বকর (রা.)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, "দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন" (সুরা আত-তাওবা, ৯:৪০)। আট বছর পর ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তিনি প্রতিশোধ নয়, বরং সার্বজনীন ক্ষমার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই বিজয় ছিল শিরকের অবসান, তাওহিদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলামের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপনের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ।

কাবা শরিফের ইতিবৃত্ত ও তাৎপর্য

পৃথিবীর সকল মুসলিমের কিবলা কাবা শরিফ তাওহিদের দৃশ্যমান প্রতীক। কোরআনে আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-কে এই পবিত্র ঘরের স্থান নির্ধারণ করে দেন এবং নির্দেশ দেন, "আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, নামাজে দণ্ডায়মান, রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো" (সুরা আল-হজ, ২২:২৬)। ইবরাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.) কাবার ভিত্তি পুনর্নির্মাণ করেন এবং মানবজাতিকে হজের জন্য আহ্বান জানানোর দোয়া করেন। যুগে যুগে কাবা পুনর্নির্মিত ও সংস্কার হলেও এর মূল তাৎপর্য অপরিবর্তিত রয়েছে। এটি কোনো গোষ্ঠী বা বর্ণের সম্পত্তি নয়, বরং এটি আল্লাহর একত্বে বিশ্বাসী সকল মানুষের মিলনকেন্দ্র। কালো গিলাফে আবৃত  এই ঘনকাকৃতির ঘর দর্শনমাত্রই মানুষের অহংকার চূর্ণ হয় এবং বান্দা তার স্রষ্টার সামনে পরম বিনম্রতায় মাথা নত করে।

প্রথম দর্শনের অপরূপ মুহূর্ত ও মাতাফে তাওয়াফ

মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে প্রথমবার কাবার দিকে তাকানোর অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত শব্দ থেমে গেছে, কেবল অশ্রুই নিরবে কথা বলছে। যে পবিত্র ঘরের দিকে ফিরে সারা জীবন নামাজ আদায় করেছি, তা বাস্তবে সামনে দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। মাতাফে লাখো মানুষ যখন একই কেন্দ্রের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে, তখন দৃশ্যতই প্রকাশ পায় যে এখানে ধনী-দরিদ্র, জাতি-বর্ণের কোনো ভেদ নেই—সবাই এক অভিন্ন পরিচয়ে আল্লাহর বান্দা।

ওমরাহর সাত চক্কর তাওয়াফ সম্পন্ন করা এক গভীর আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা। তাওয়াফকে রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজের সাথে তুলনা করে এর বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। তাওয়াফের প্রতিটি পদক্ষেপ বান্দাকে শেখায় কিভাবে পুরো জীবনের সকল বিচ্ছিন্নতা ও বিক্ষিপ্ততাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একক কেন্দ্রে মিলিত করতে হয়। মাতাফের এই অভিজ্ঞতা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় মহাবিশ্বের প্রতিটি কণাও যেন এক অদৃশ্য বিধানে তার স্রষ্টার চারপাশে আবর্তিত হচ্ছে।

ওমরাহ: ক্ষমা, নবজন্ম ও আনুগত্যের প্রতীকী সাধনা

কোরআনের নির্দেশনা হলো, "তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ ও ওমরাহ পূর্ণ করো" (সুরা আল-বাকারা, ২:১৯৬)। ওমরাহর প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত অর্থবহ। ইহরামের শুভ্র পোশাক বান্দাকে পার্থিব মর্যাদার বেড়াজাল ছিন্ন করে সরলতা ও মৃত্যুর শুভ্র কাফনের কথা স্মরণ করায়। তাওয়াফ জীবনের কেন্দ্র নির্ধারণ করে দেয়, আর সাফা-মারওয়ার সাঈ (সাফা ও মারওয়া পাহাড়দ্বয়ের মাঝে সাতবার দৌড়ানো) নিরন্তর প্রচেষ্টার শিক্ষা দেয়। হালক বা কসর (চুল মুণ্ডন বা ছাঁটা) হলো অতীতের গুনাহ থেকে মুক্তি ও নবজীবনের প্রতীকী ঘোষণা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "এক ওমরাহ থেকে পরবর্তী ওমরাহ মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহের কাফফারা স্বরূপ" (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)। সুতরাং, ওমরাহ নিছক আনুষ্ঠানিকতা বা ভ্রমণ নয়; এটি তাওবা, আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর প্রতি পরম আনুগত্যের নবায়ন এবং দেশে ফিরে একটি সংশোধিত, উন্নত চরিত্রের মানুষ হিসেবে জীবন অতিবাহিত করার সুদৃঢ় অঙ্গীকার।

সাফা-মারওয়া: এক মায়ের অটল বিশ্বাসের অমর স্মারক

সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর প্রতীকসমূহের অন্যতম। সুতরাং যে কেউ (কাবা) ঘরের হজ বা ওমরাহ করে, তার জন্য এই দুই পাহাড়ের মধ্যে সাঈ করায় কোনো দোষ নেই" (সুরা আল-বাকারা, ২:১৫৮)। এই পথের প্রতিটি চক্কর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ইসমাইল (আ.)-এর মা হাজেরা (আ.)-এর ব্যাকুলতা ও আল্লাহর প্রতি তার অবিচল আস্থার কথা। জনমানবহীন মরু উপত্যকায় তৃষ্ণার্ত শিশুপুত্রের জন্য পানির সন্ধানে তিনি সাফা থেকে মারওয়ায় এবং মারওয়া থেকে সাফায় ছুটেছিলেন। সপ্তমবারের প্রচেষ্টার পর আল্লাহর অপার রহমতে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে ভূমি থেকে জমজম কূপের পানি প্রবাহিত হয়।

সাফা-মারওয়ায় দোয়া ও জিকির করা রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ। তবে, পাহাড়ের নির্দিষ্ট কোনো স্থানে বিশেষ ইবাদতের অতিরিক্ত ফজিলতের বিষয়ে সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয় এমন দাবি থেকে বিরত থাকা উচিত। এখানকার মূল শিক্ষা হলো, "তাওয়াক্কুল" বা আল্লাহর ওপর ভরসা মানে নিষ্ক্রিয় বসে থাকা নয়; বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনার নামই হলো প্রকৃত তাওয়াক্কুল।

জমজম কূপ: রহমত, বরকত ও আধুনিক বিজ্ঞান

জমজম কূপের জন্ম এক অসহায় মা ও তৃষ্ণার্ত শিশুর জন্য আল্লাহর অলৌকিক সাহায্যের এক জীবন্ত নিদর্শন। এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম ও বরকতময় পানির উৎসগুলোর একটি। হাদিসে এসেছে, "জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, আল্লাহর ইচ্ছায় তা পূরণ হয়।" তাই জমজম হাতে নিয়ে আমরা ক্ষমা, সুস্থতা, হালাল  রিজিক ও ঈমানের ওপর দৃঢ়তার জন্য দোয়া করেছি।

আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাও জমজমের পানির বিশেষত্ব স্বীকার করে। একটি আইসিপি-এমএস (Inductively Coupled Plasma Mass Spectrometry) গবেষণা ২০২২ সালে এই পানিতে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো উপকারী খনিজের প্রাচুর্য এবং ক্ষতিকর ভারী ধাতুর অত্যন্ত কম উপস্থিতি লক্ষ্য করেছে। আরেকটি তুলনামূলক গবেষণা এর রাসায়নিক গঠনকে অনন্য ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করলেও মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের (TDS) মাত্রা নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করেছে। এসব গবেষণা পানিটির বিশেষ ভৌত-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে, তবে জমজমের বরকত নিছক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে, যা ঈমানের বিষয়। এটি কোনো রোগের চিকিৎসায় সরাসরি বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

দাব্বাতুল আরদ: কিয়ামতের এক আলোচিত নিদর্শন

সাফা-মারওয়ার প্রান্তর ও কিয়ামতের নিদর্শনাবলির কথা স্মরণ করে কোরআনের সুরা আন-নামলের ৮২ নম্বর আয়াতের কথা মনে পড়ে। আয়াতে বলা হয়েছে, যখন নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসবে, তখন আল্লাহ পৃথিবী থেকে এক বিশেষ জীব (দাব্বাতুল আরদ) বের করবেন, যে মানুষের সাথে কথা বলবে, কারণ তারা তাঁর নিদর্শনে বিশ্বাস করত না। একাধিক সহিহ হাদিসে দাব্বাতুল আরদের আবির্ভাবকে কিয়ামতের বড় আলামতগুলোর অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তবে, এটি নিশ্চিতভাবে সাফা পাহাড়ের নির্দিষ্ট কোনো স্থান থেকেই বের হবে—এমন কোনো দাবি অকাট্য দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত নয়। দাব্বাতুল আরদের প্রতি বিশ্বাস রাখা জরুরি, কিন্তু এর আলোচনার মূল লক্ষ্য আমাদের কৌতূহল নিবৃত্তি নয়; বরং এই শিক্ষা গ্রহণ করা যে, দুনিয়ার সবকিছুই ধ্বংসশীল, এবং পরকালের কঠিন জবাবদিহির জন্য আমাদের সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে। এই বিশ্বাস ঈমানকে দৃঢ় করে এবং সৎকর্মে অনুপ্রাণিত করে।

প্রবাসে আতিথেয়তার মহিমা ও জেদ্দা ভ্রমণ

ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা এই সফরকে অনন্য করে তুলেছে। জাহাঙ্গীর ভাই, আনোয়ার ভাই, তাজুল ইসলাম ভাই ও আবদুর রহমান ভাইয়েরা যে আন্তরিকতা, সময় ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তা ভোলার নয়। পরিবারের সদস্যদের কাছে আমাদের নিরাপদে পৌঁছানোর খবর পৌঁছে দিয়ে আমরা যেন এই পরিচিত মানুষগুলোর ভালোবাসাময় আতিথেয়তার মাঝেই হারিয়ে গিয়েছিলাম। তাঁদের ব্যবহার মনে করিয়ে দিয়েছে, ঈমানের বন্ধনই কখনো কখনো রক্তের সম্পর্ককেও ছাড়িয়ে যায়।

একদিনের জেদ্দা ভ্রমণ ছিল পবিত্র যাত্রার মধ্যে এক কোমল অবসর। লোহিত সাগরের তীরবর্তী এই ঐতিহাসিক বন্দরনগরী দীর্ঘকাল ধরে মক্কার প্রবেশদ্বার। বিকেলের নরম রোদে সাগরের নীল জলের দিকে তাকিয়ে স্রষ্টার অসীম কুদরতের চিন্তায় মন ভরে যায়। ঢেউয়ের অনবরত আগমন ও প্রত্যাবর্তন আমাদের পার্থিব জীবনের সফর ও মহান প্রভুর কাছেই চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তনের গভীর বার্তা দিয়ে যায়।

এই সফরের সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী অধ্যায় ছিল ব্যবসায়ী মান্নান ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত। তাঁর আতিথেয়তা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, ছিল সম্পূর্ণ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। প্রবাসের ব্যস্ততম সময়ের মধ্যেও তিনি ও তাঁর পরিবার যে অকৃত্রিম মমতা, যত্ন ও পরম আদরে আমাদের আপ্যায়ন করেছেন, তা আমাদের পরম সৌভাগ্য। সেই খাবারের স্বাদ হয়তো একদিন বিস্মৃত হব, কিন্তু তাঁদের আন্তরিকতা, মুখের হাসি ও বিদায়ের মুহূর্তের স্নেহার্দ্র দোয়াগুলো হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবে। এ যেন এক জীবন্ত উদাহরণ যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অতিথিকে ভালোবাসা দিয়ে গ্রহণ করাও একটি মহৎ ইবাদত।

বিদায় ও চিরকালীন আকুতি

সবশেষে দেশে ফেরার পালা এলো। ব্যাগ গুছিয়েছি, কিন্তু মন যেন মাতাফের প্রান্তরেই পড়ে রইল। কাবার দিকে শেষবার তাকিয়ে মনে হলো, শরীর দেশে ফিরলেও আত্মার একটি গভীর অংশ এই পবিত্র নগরীতে থেকে গেল।

মদিনার প্রশান্তি, মক্কার মহিমা, সাফা-মারওয়ার ইতিহাস, জমজমের স্বাদ, জেদ্দার সাগর এবং সর্বোপরি প্রিয় মানুষগুলোর নিঃস্বার্থ আতিথেয়তা—সব মিলিয়ে এই সফর একটি সাধারণ ভ্রমণ নয়, বরং আত্মার এক মহাজাগরণ হয়ে রইল।

হে আল্লাহ, আমাদের ওমরাহ কবুল করুন, ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিন এবং এই সফরের পবিত্র শিক্ষা সারাজীবন ধারণ করার তাওফিক দান করুন। জাহাঙ্গীর ভাই, আনোয়ার ভাই, তাজুল ইসলাম ভাই, আবদুর রহমান ভাই, মান্নান ভাই এবং যাঁরা আমাদের সেবা ও ভালোবাসায় সিক্ত করেছেন, তাঁদের পরিবার, ব্যবসা, স্বাস্থ্য ও ঈমানে অফুরন্ত বরকত দিন। সকল মুমিনকে আপনার পবিত্র ঘর ও প্রিয় নবী (সা.)-এর নগরী জিয়ারতের সৌভাগ্য দান করুন। আমাদের আবারও বায়তুল্লাহর ছায়ায় ফিরিয়ে নিন, এমন এক নির্মল ও বিনীত হৃদয় নিয়ে—যা সম্পূর্ণরূপে আপনারই প্রতি সমর্পিত। আমিন।

(লেখক-জননিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অতিরিক্ত আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ অব:)

সিয়াম সরিষা
Link copied!