বাংলাদেশিরাই এখন সাগরপথে ইতালি ও গ্রীসে যাওয়ার শীর্ষে

নিজস্ব প্রতিবেদক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম

বাংলাদেশিরাই এখন সাগরপথে ইতালি ও গ্রীসে যাওয়ার শীর্ষে

ফাইল ফটো

ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন, বিদেশে চাকরির প্রলোভন এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার জাল মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন মানবপাচারের অন্যতম বড় উৎস দেশে পরিণত হয়েছে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি ও গ্রীসে প্রবেশের চেষ্টায় বাংলাদেশিরা এবারও শীর্ষে রয়েছে। একই সঙ্গে কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও অন্যান্য দেশে চাকরির নামে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকে পড়া, রাশিয়ার যুদ্ধে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ এবং নারী পাচারের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য ও গবেষণায় উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র।

ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যের বরাত দিয়ে ব্র্যাক জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই একই পথে ইতালিতে পৌঁছেছেন ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং লিবিয়া থেকে গ্রীসে গেছেন আরও ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি। ফলে ইতালির পাশাপাশি গ্রীসগামী অনিয়মিত অভিবাসীদের তালিকাতেও বাংলাদেশ এখন শীর্ষে।

এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় প্রাণহানি ও নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে। চলতি বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রীসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। লিবিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রেখে অসংখ্য বাংলাদেশিকে নির্যাতন, মুক্তিপণের জন্য জিম্মি এবং পরিবারের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তবু ইউরোপে যাওয়ার এই প্রবণতা কমছে না।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, অনিয়মিতভাবে ইউরোপে যাওয়া ব্যক্তিদের বেশিরভাগের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। মাদারীপুর, শরীয়তপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ অন্তত ১০ থেকে ১২ জেলার মানুষ এ পথে বেশি যাচ্ছেন। পাচারকারীরা এখন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম ব্যবহার করে ইতালিতে পৌঁছানোর গল্প ও নৌকার ছবি দেখিয়ে নতুন মানুষ সংগ্রহ করছে।

মানবপাচারের পাশাপাশি নতুন সংকট হয়ে উঠেছে সাইবার স্ক্যাম। চাকরির আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশিদের কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বিভিন্ন স্ক্যাম সেন্টারে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে নেওয়া ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশ প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। ৯০ শতাংশকে জোর করে প্রতারণামূলক কাজে যুক্ত করা হয়েছে। ৮৮ শতাংশের চলাফেরা সীমিত ছিল, ৮৬ শতাংশের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং অনেকেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় গেছেন। তবে সাম্প্রতিক অভিযানে সেখানকার স্ক্যাম সেন্টার থেকে উদ্ধার হয়ে শুধু জুন মাসেই দেশে ফিরেছেন ৫৮৩ জন বাংলাদেশি।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈধ চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে ভিজিট ভিসায় বিদেশে নিয়ে গিয়ে পাসপোর্ট জব্দ করে বিভিন্ন স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়। নির্ধারিত প্রতারণার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে মারধর, বৈদ্যুতিক শক এবং টর্চার সেলে নির্যাতনের মতো ঘটনাও ঘটেছে।

শুধু সাইবার স্ক্যাম নয়, রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়েও বাংলাদেশিদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। নিরাপত্তারক্ষী, নির্মাণশ্রমিক বা ওয়েল্ডারের চাকরির কথা বলে অনেককে বৈধ ভিসায় রাশিয়ায় নেওয়ার পর সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তদন্তে এই অভিযোগের সত্যতা উঠে এসেছে। এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্যও সামনে এসেছে।

নারী পাচারের ঘটনাও উদ্বেগজনক। গৃহকর্মী, পোশাক কারখানা বা বিউটি পার্লারের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে অনেক নারীকে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক যৌন শোষণ বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে। দেশে ফিরে অনেক ভুক্তভোগী মামলা করলেও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে।

রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও মানবপাচার অব্যাহত রয়েছে। কক্সবাজার ও টেকনাফ উপকূল ব্যবহার করে রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশিদের মালয়েশিয়ায় পাচারের ঘটনা থামেনি। গত আট বছরে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হলেও পাচারচক্র সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের পর অনেককেই সাগরপথে পাচার করা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মানবপাচারসংক্রান্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা বিচার বা তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টির তদন্ত শেষ হয়নি। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে নতুন ৫০০টির বেশি মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি।

এ পরিস্থিতিতে সরকার 'মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬' প্রণয়ন করেছে। নতুন আইনে অভিবাসী চোরাচালানকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং সংঘবদ্ধ মানবপাচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রাখা হয়েছে।

তবে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসানের মতে, শুধু কঠোর আইন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পাচারচক্রের মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনা, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর মানবপাচার মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো, মানবপাচারপ্রবণ জেলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

সিয়াম সরিষা
Link copied!