রাজউকের ৬০ কোটি টাকার জমি বেদখলে নিলেন প্রতিবন্ধী মজিবর!

অনিক খাঁন , সিনিয়র রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০১:৩১ এএম

রাজউকের ৬০ কোটি টাকার জমি বেদখলে নিলেন প্রতিবন্ধী মজিবর!

ফাইল ফটো

রাজধানীর উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রায় ২০-২১ কাঠা সরকারি জমি দীর্ঘদিন ধরে দখল করে সেখানে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, ভাড়া বাণিজ্য পরিচালনা এবং অবৈধ পানি সংযোগ নেওয়ার অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন মজিবুর রহমান ওরফে ‘প্রতিবন্ধী মজিবর’। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) পরিচালনার আবেদন করেছে ঢাকা ওয়াসা। একই সঙ্গে রাজউক জানিয়েছে, নির্ধারিত সময় শেষ হলে পুনরায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবশিষ্ট অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হবে।

সরকারি জমিতে টিনশেড মার্কেট, কোটি টাকার ভাড়া বাণিজ্যের অভিযোগ:  স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজউকের প্রায় ২০-২১ কাঠা সরকারি জমি দখল করে সেখানে ৬০টিরও বেশি টিনশেড দোকান ও বসতঘর নির্মাণ করেছেন অভিযুক্ত মজিবুর রহমান ওরফে প্রতিবন্ধী মজিবর । রাজউকের কর্মকর্তাদের মতে, দখলকৃত জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, এসব দোকান ও ঘর থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করা হয়। বছরে যার পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি টাকা। এছাড়া দোকান বরাদ্দ ও ব্যবসা পরিচালনার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

সরেজমিনে যা দেখা গেল : উত্তরার ১৫ নম্বর সেক্টরের ব্লক-এ, বি ও ডি এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, লেকপাড়জুড়ে সারিবদ্ধভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য টিনশেড দোকান ও বসতঘর। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি দোকান ও ঘরের জন্য মাসিক ২ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সরকারি জমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ভাড়া বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরে চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

ওয়াসার তদন্তে অবৈধ পানির সংযোগের প্রাথমিক সত্যতা: ঢাকা ওয়াসার জোন-১০-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান গত ২০ জুলাই ২০২৬ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানান, উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে দুটি স্থানে অবৈধ পানির সংযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সেক্টর-১৫-এর ব্লক-বি, কূপ নম্বর-২১ সংলগ্ন পানির পাম্প কম্পাউন্ডের পশ্চিম পাশে ‘মজিবর’ নামে এক ব্যক্তি অনুমোদন ছাড়াই টিনশেড ঘর নির্মাণ করে অবৈধ পানির সংযোগ নিয়েছেন। এছাড়া একই এলাকার একটি বৈধ পানির মিটার বাইপাস করে একটি হোটেল ও একটি মুদি দোকানে অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ওয়াসা জানিয়েছে, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে স্থানীয়ভাবে বাধার মুখে পড়তে হয়। তাই নিরাপদ পানি সরবরাহ, সরকারি রাজস্ব সুরক্ষা এবং জনস্বার্থে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করা হয়েছে।

রাজউকের উচ্ছেদ অভিযান, সময় শেষে ফের অভিযান: রাজউক (জোন-১)-এর অথরাইজড অফিসার এহসানুল ইমাম জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২০ জুলাই উত্তরা সেক্টর-১৫-এর ব্লক-এ, বি ও ডি এলাকার লেকসংলগ্ন অংশে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। তিনি বলেন, অভিযানে কয়েকটি অবৈধ স্থাপনা আংশিকভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে। মানবিক বিবেচনায় অবশিষ্ট স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় শেষ হলে অফিস আদেশ অনুযায়ী যেকোনো সময় পুনরায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত মজিবুর রহমান রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন। তবে রাজউক কোনো অনুমোদন দেয়নি। মানবিক কারণে তাকে দুই মাসের মধ্যে অন্যত্র স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সময়সীমা শেষ হলে তার স্থাপনাও উচ্ছেদ করা হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ: প্রভাব খাটিয়ে দখল ও নানা অনিয়ম: স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট এক নেতার প্রভাব ব্যবহার করে সরকারি জমি দখল করেছেন। তাদের অভিযোগ, দখলকৃত এলাকায় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, ভাড়া বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, “মজিবর একজন ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী। সরকারি জমি দখল করাই তার কাজ। তিনি প্রতিবন্ধী হলেও সেই পরিচয়কে আবেগের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করেন। অভিযানে গেলেই নিজেকে প্রতিবন্ধী বলে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন।”

আরেক বাসিন্দা জাজ মিয়া বলেন, “মজিবর প্রতিবন্ধী হলেও এখন রাজউকের প্রায় ৬০ কোটি টাকার জমি দখল করে কোটিপতি হয়েছেন। শুধু জমি দখল নয়, এলাকায় মাদক কারবার নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে।” অভিযুক্ত মজিবুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার না করে বলেন,“আমি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। অনেক কষ্ট করে রাজউকের জমিতে বাড়ি করেছি। আমাকে কেন আপনারা বিরক্ত করছেন?” এ কথা বলেই তিনি দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

রাজউকের মূল্যবান সরকারি জমিতে বছরের পর বছর ধরে কীভাবে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠল? অবৈধ পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ কারা দিল? ভাড়া বাণিজ্যের বিপুল অর্থ কোথায় গেল? সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি থাকা সত্ত্বেও কেন এতদিন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এসব প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।  ওয়াসার মোবাইল কোর্ট পরিচালনার আবেদন এবং রাজউকের চলমান উচ্ছেদ কার্যক্রমের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সরকারি জমি দখল, অবৈধ সংযোগ এবং ভাড়া বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সিয়াম সরিষা
Link copied!