এই দেশে একটা সময় এমন ছিল যে, শুক্রবার মানেই ছিল নতুন সিনেমার পোস্টার, টিকিটের দীর্ঘ লাইন আর লোকে লোকারণ্য প্রেক্ষাগৃহসমূহ। ঈদ এলে এদেশের সিনেমা হলগুলোর সামনে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। একটি নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়া মানেই ছিল শহর থেকে মফস্বল পর্যন্ত তীব্র আলোচনার ঝড়। এলাকার রাস্তাঘাটে মাইকে মাইকে শোনা যেত তার প্রচার-প্রসার। আজ সেই প্রেক্ষাগৃহের অনেকগুলোই শপিং কমপ্লেক্স, গুদামঘর কিংবা পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে। কিন্ত একই সময়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আবার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিতও হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা বিশ্ব দর্শকদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন, আর ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মে দেশীয় গল্প নতুন ভাষায় ফিরে আসছে। এই বৈপরীত্যই আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে, তা হলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প কি তবে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে, নাকি দীর্ঘ সংকট অতিক্রম করে একটি নতুন যুগে প্রবেশ করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কেবল বর্তমানকে দেখলে হবে না, ফিরে তাকাতে হবে ইতিহাসের দিকে। কারণ একটি দেশের চলচ্চিত্র শিল্প কখনোই শুধু বিনোদনের ব্যবসা নয়। এটি সেই দেশের ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ভাষা, অর্থনীতি এবং মানুষের সম্মিলিত স্মৃতির দৃশ্যমান রূপ। যে জাতি তার চলচ্চিত্রকে গুরুত্ব দেয়, সে জাতি মূলত নিজের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎকেই গুরুত্ব দেয়। এ কারণেই আজ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো চলচ্চিত্রকে শুধু শিল্প হিসেবে নয়, একটি কৌশলগত সাংস্কৃতিক শক্তি (soft power) হিসেবেও বিবেচনা করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র ও সিরিজ, ভারতের হিন্দি ও আঞ্চলিক সিনেমা কিংবা তুরস্কের ঐতিহাসিক সুলতানী নাটক এসব শুধু বিনোদন নয়, এগুলো নিজ নিজ দেশের সংস্কৃতি, ভাষা, পর্যটন এবং অর্থনীতিকে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চলচ্চিত্রের ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাস শতবর্ষেরও বেশি পুরোনো। অবিভক্ত বাংলার চলচ্চিত্রচর্চা, কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যনির্ভর সিনেমার ঐতিহ্য, পূর্ব পাকিস্তান আমলের সাংস্কৃতিক সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী জাতীয় পুনর্গঠনের অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারার উত্তরসূরি। এই ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো এসেছে তখনই, যখন নির্মাতারা ইতিহাস-ঐতিহ্য, মানুষের জীবন, সমাজ ও সময়কে আন্তরিকভাবে ধারণ করেছেন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এক অসাধারণ সৃজনশীল সময় অতিক্রম করে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, গ্রামীণ সমাজ, নদীমাতৃক জীবন, সাহিত্য, প্রেম, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য এবং সাধারণ মানুষের সংগ্রাম চলচ্চিত্রের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। সূর্য দীঘল বাড়ী, সারেং বৌ, ধীরে বহে মেঘনা, গোলাপী এখন ট্রেনে, চাকা, আগুনের পরশমণি, মাটির ময়না- এসব চলচ্চিত্র কেবল শিল্পসাফল্যের উদাহরণ নয়, এগুলো বাংলাদেশের আত্মপরিচয়েরও অংশ। এই চলচ্চিত্রগুলো প্রমাণ করেছিল যে সীমিত অর্থ, সীমিত প্রযুক্তি কিংবা দুর্বল অবকাঠামো কখনোই মহান শিল্প সৃষ্টির প্রধান বাধা নয়। প্রয়োজন হয় একটি শক্তিশালী গল্প, সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিজের সমাজকে গভীরভাবে বোঝা ও উপলব্ধির ক্ষমতা।
এক সময় দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহর, এমনকি বহু উপজেলা শহরেও সিনেমা হল ছিল। আমাদের ছোটবেলায়ও আমরা শুধু পুরান ঢাকা ও তার আশেপাশেই অন্তত ১৩-১৪ টি সিনেমা হল দেখেছি। সে সময় চলচ্চিত্র দেখা ছিল একটি সামাজিক অভিজ্ঞতা ও অবকাশের অংশ। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রতিবেশীরা একসঙ্গে সিনেমা দেখতে যেতেন। একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নিয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ আলোচনা চলত। চলচ্চিত্র তখন কেবল বিনোদনের উপকরণ ছিল না, এটি ছিল সামাজিক সংলাপের অংশ। মানুষের হাসি, কান্না, প্রেম, প্রতিবাদ এবং স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটত রূপালি পর্দায়।
কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো কোনো শিল্প যদি সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও বদলাতে না পারে, তবে সে শিল্প সংকটে পড়ে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও সেই বাস্তবতা থেকে মুক্ত নয়। নব্বইয়ের দশকের পর বিশ্বায়ন, স্যাটেলাইট টেলিভিশনের বিস্তার, ভিডিও প্রযুক্তি, পাইরেসি এবং পরবর্তীতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা মানুষের বিনোদনের অভ্যাস আমূল বদলে দেয়। একই সঙ্গে চলচ্চিত্রশিল্পের ভেতরেও মৌলিক গল্পের সংকট, তারকা নির্ভরতা, দুর্বল পরিচালনা ও প্রযোজনা, অনুকরণ প্রবণতা এবং স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক চিন্তা ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে। ফলে যে শিল্প একসময় জাতির আত্মপরিচয় বিনির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল, সেটিই ধীরে ধীরে দর্শকের আস্থা হারাতে শুরু করে।
তবে এখানেই গল্প শেষ নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হয় আরেকটি অধ্যায়। কারণ প্রযুক্তি যেমন সংকট তৈরি করেছে, তেমনি নতুন সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিয়েছে। ডিজিটাল ক্যামেরা, স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ, আন্তর্জাতিক সহ-প্রযোজনা, চলচ্চিত্র উৎসব এবং ওটিটি(OTT) প্ল্যাটফর্ম আজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। তাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো আমরা কি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি নতুন চলচ্চিত্র-ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করতে পারব, নাকি আবারও সহজ বাণিজ্যিক সাফল্যের মোহে আমাদের সাংস্কৃতিক শক্তিকে হারিয়ে ফেলব?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান বাস্তবতা, সংকট এবং সম্ভাবনাকে নতুন করে বিশ্লেষণ করা জরুরি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান সংকটকে অনেকেই কেবল "ভালো সিনেমা হচ্ছে না" এই সরল ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখেন কিংবা রাখতে চান। কিন্তু এর বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। একটি চলচ্চিত্রশিল্প কখনো একক কোনো কারণে দুর্বল হয় না। বরং অর্থনীতি, প্রযুক্তি, রাষ্ট্রের নীতি, প্রদর্শনব্যবস্থা, শিক্ষা, বিনিয়োগ এবং দর্শকের রুচির পরিবর্তন সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই তার গতিপথ নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি এসেছে প্রযোজক, পরিচালক কিংবা অভিনেতাদের কথা। অথচ একটি বিষয় তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়েছে আর তা হচ্ছে প্রদর্শনব্যবস্থা। সিনেমা নির্মাণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই সিনেমা দর্শকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা। একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা শত শত প্রেক্ষাগৃহ চলচ্চিত্র শিল্পের প্রাণ ছিল। নতুন সিনেমা মুক্তি পেলে একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রদর্শিত হতো, ফলে একটি চলচ্চিত্র দ্রুত দর্শকের কাছে পৌঁছাত। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহগুলো ধারাবাহিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই কাঠামোটি ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে। যখন প্রদর্শনের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়, তখন বিনিয়োগও কমে যায়, আর বিনিয়োগ কমলে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণের ঝুঁকি নিতে অনেকে আগ্রহ হারান। এই দুষ্টচক্র বহু বছর ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে ধীরে ধীরে দুর্বল করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্যিকীকরণের আরো এক অসম প্রতিযোগিতা। ব্যবসা অবশ্যই চলচ্চিত্রের একটি অপরিহার্য অংশ। কিন্তু যখন ব্যবসাই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন শিল্পের জায়গাটি সংকুচিত হতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশক থেকে আমরা এমন একটি প্রবণতা দেখেছি, যেখানে মৌলিক চিত্রনাট্যের পরিবর্তে অনুকরণ, তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার জন্য অতিনাটকীয়তা এবং তারকা-নির্ভর নির্মাণ ক্রমে প্রধান হয়ে ওঠে। এতে কিছু চলচ্চিত্র আর্থিকভাবে সফল হলেও সামগ্রিকভাবে দর্শকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দর্শক ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেছেন যে একই ধরনের গল্প, একই ধরনের উপস্থাপনা এবং একই ধরনের বিনোদন দীর্ঘমেয়াদে তাদের আর আকৃষ্ট করছে না।
কিন্তু এই সময়েই বিশ্বজুড়ে বিনোদনের মানচিত্র বদলে যেতে থাকে। ইন্টারনেট মানুষের হাতে এমন একটি স্বাধীনতা এনে দেয়, যা আগে কখনো ছিল না। একজন দর্শক এখন একই দিনে বাংলাদেশ, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তুরস্ক, ইউরোপ কিংবা লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্র দেখতে পারেন। ফলে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের প্রতিযোগী এখন আর শুধু পাশের দেশের সিনেমা নয়, এটি এখন পুরো বিশ্ব। এই বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে কেবল বড় বাজেট নয়, বড় চিন্তাও দরকার।
তবে সংকটের মাঝেও ইতিবাচক পরিবর্তন যে ঘটছে না তা নয়। গত এক দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের আবির্ভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তারা প্রচলিত ফর্মুলার বাইরে এসে শহর ও গ্রামের নতুন বাস্তবতা, মধ্যবিত্তের মানসিক সংকট, তরুণ সমাজের দ্বিধা, স্মৃতি, পরিচয়, নারীর অভিজ্ঞতা এবং সমকালীন সামাজিক প্রশ্নকে চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। একই সঙ্গে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা চলচ্চিত্র নির্মাণের ব্যয় তুলনামূলকভাবে কমিয়েছে, ফলে নতুন নির্মাতাদের জন্য প্রবেশের সুযোগও বেড়েছে।
ওটিটি( OTT) প্ল্যাটফর্ম এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আগে একটি চলচ্চিত্রের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করত প্রেক্ষাগৃহে কতদিন চলল তার ওপর। এখন একটি চলচ্চিত্র বা ওয়েব ফিল্ম দেশের সীমানা পেরিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পৌঁছাতে পারছে। এই পরিবর্তন নির্মাতাদের সামনে নতুন স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। তারা অপেক্ষাকৃত সাহসী বিষয়, ভিন্নধর্মী আখ্যান এবং পরীক্ষামূলক নির্মাণ নিয়ে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে এখানেও সতর্ক থাকার কারণ আছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেমন স্বাধীনতা দেয়, তেমনি অ্যালগরিদমের একটি অদৃশ্য চাপও তৈরি করে। দর্শক কী দেখতে চান, কোন ধরনের বিষয় দ্রুত জনপ্রিয় হয়, কোন বিষয় বেশি ক্লিক পায় এসব বিবেচনা কখনো কখনো নির্মাতাদের শিল্পগত সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করে। ফলে প্রেক্ষাগৃহের বাজারের পরিবর্তে ডিজিটাল বাজারের নতুন এক বাণিজ্যিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। তাই শুধু মাধ্যম বদলালেই চলচ্চিত্রের সংকট দূর হবে এমনটি ভাবার সুযোগ নেই।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সামনে আজ যে সংকট, সেটি কেবল অর্থের সংকট নয়, এটি আস্থারও সংকট। দর্শক এমনসব চলচ্চিত্র দেখতে চান, যেখানে তারা নিজেদের জীবন, সমাজ, ভাষা, ইতিহাস এবং স্বপ্নের প্রতিফলন খুঁজে পাবেন। যখন সেই সংযোগ তৈরি হয়, তখন সীমিত বাজেটের চলচ্চিত্রও অসাধারণ সাড়া পায়। আবার সেই সংযোগ হারিয়ে গেলে বড় বাজেটও দর্শককে হলে টানতে পারে না। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রয়াত পরিচালক তারেক মাসুদের মাটির ময়না সিনেমাটিই একটি বড় উদাহরণ। এই সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে তারেক মাসুদ তেমন কোনো উন্নত প্রযুক্তিই ব্যবহার করার সুযোগ পাননি। কিন্ত সিনেমার গল্প ও ভাষাশৈলী শক্তিশালী হওয়ায় আজও দশকের পর দশক ধরে তা দর্শকদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয় হয়ে আছে।
সুতরাং আজকের বাস্তবতা আমাদের একটি স্পষ্ট শিক্ষা দেয় যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের সংকটের সমাধান কেবল আরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণে নয়, বরং আরও ভালো মানের চলচ্চিত্র নির্মাণে। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি নয়, প্রচারণাও নয়, দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী স্থান করে নেয় একটি শক্তিশালী গল্প, বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র এবং শিল্পের সততা।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হওয়ার যেমন কারণ আছে, তেমনি আশাবাদী হওয়ারও যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। কারণ ইতিহাস বলছে, এই শিল্প তার সবচেয়ে বড় সাফল্য অর্জন করেছে তখনই, যখন সংকটকে অতিক্রম করে নতুন ভাষা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করতে পেরেছে। আজও সেই সুযোগ রয়েছে। তবে এই পুনর্জাগরণ হুট করেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটবে না, এর জন্য রাষ্ট্র, শিল্প, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত এবং দর্শকসহ সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরা নিন্মে বর্ণিত কিছু পদক্ষেপ বিবেচনা করতে পারি যা এই শিল্পের নীতিনির্ধারকরা গ্রহণ করতে পারেন কিনা তা ভেবে দেখবেন।
প্রথমত, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে কেবল বিনোদন শিল্প হিসেবে নয়, সৃজনশীল অর্থনীতির (Creative Economy) একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান বিশ্বে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, অ্যানিমেশন, গেমিং ও ডিজিটাল কনটেন্ট, সব মিলিয়ে সৃজনশীল শিল্প অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। বাংলাদেশেও এই খাতে বিপুল কর্মসংস্থান, বৈদেশিক আয় এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতির সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা, বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চলচ্চিত্রের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা চিত্রনাট্য উন্নয়ন। এটি নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে হবে। প্রযুক্তি কেনা যায়, ক্যামেরা আমদানি করা যায়, কিন্তু কেবল অর্থ দিয়ে একটি মৌলিক গল্প সৃষ্টি করা যায় না । আমাদের অতীত ইতিহাস, সাহিত্য, লোককাহিনি, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, জুলাই বিপ্লব, নদী, নগরজীবন, অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, তরুণ সমাজের মানসিক সংকট কিংবা প্রান্তিক মানুষের জীবন এসব বিষয়েই এমন অসংখ্য গল্প রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। বিশ্ব চলচ্চিত্রের সাম্প্রতিক সাফল্যও দেখায়, স্থানীয় গল্পই সবচেয়ে বেশি বৈশ্বিক আবেদন তৈরি করে।
তৃতীয়ত, চলচ্চিত্রশিক্ষা ও গবেষণাকে আরও বেশী শক্তিশালী করতে হবে। একটি শক্তিশালী চলচ্চিত্রশিল্প কেবল জনপ্রিয় অভিনেতা বা সফল পরিচালকের ওপর দাঁড়ায় না, এর পেছনে থাকে দক্ষ চিত্রনাট্যকার, সম্পাদক, চিত্রগ্রাহক, শব্দ-প্রকৌশলী, শিল্প-নির্দেশক, গবেষক এবং সমালোচকদের দীর্ঘ প্রস্তুতি। বিশ্ববিদ্যালয়, চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউট এবং চলচ্চিত্র সংসদগুলোকে আরও সক্রিয় করা জরুরি। বাংলাদেশের অল্প কয়টি বিশ্ববিদ্যালয়েই এখনো পর্যন্ত ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনা হয়।এটি আরো বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি পুরোনো চলচ্চিত্র সংরক্ষণ, ডিজিটাল রিস্টোরেশন এবং জাতীয় চলচ্চিত্র আর্কাইভকে আধুনিকায়ন করাও সময়ের দাবি।
চতুর্থত, প্রেক্ষাগৃহকে নতুনভাবে কল্পনা করতে হবে। অতীতের মডেল হয়তো আর পুরোপুরি ফিরবে না, কিন্তু আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমুখী প্রদর্শনকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। দেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে ছোট ও মাঝারি আকারের আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ, স্থানীয় চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন এবং চলচ্চিত্রকে পারিবারিক বিনোদনের নিরাপদ পরিসর হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সিনেমা হলে যাওয়ার অভিজ্ঞতাকে যদি নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করা না যায়, তবে চলচ্চিত্রের সামাজিক চরিত্রও দিনকে দিন আরো দুর্বল হয়ে পড়বে।
পঞ্চমত, ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। বিশ্বজুড়ে এখন প্রেক্ষাগৃহ ও স্ট্রিমিং দুটি মাধ্যমই পাশাপাশি চলছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা গ্রহণ করতে হবে। একটি চলচ্চিত্রের জীবনচক্র এখন শুধু মুক্তির প্রথম সপ্তাহে সীমাবদ্ধ নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেটি বহু বছর ধরে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে। তাই নির্মাতাদেরও নতুন দর্শক-অভ্যাস এবং নতুন ব্যবসায়িক মডেল সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস। দীর্ঘদিন ধরে আমরা প্রায়ই বিদেশি চলচ্চিত্রের সাফল্যকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ইতিহাস বলছে, যে চলচ্চিত্র নিজের সমাজ, ভাষা ও মানুষের কাছে সত্য থাকে, সেই চলচ্চিত্রই শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্যতা পায়। ইরানের সিনেমা, দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র কিংবা লাতিন আমেরিকার অনেক নির্মাতার কাজ তারই বড় প্রমাণ। বাংলাদেশেরও শক্তি এখানেই। আমাদের ইতিহাস, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বই ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান, আমাদের নদী, আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, আমাদের মানুষের অসংখ্য অপ্রকাশিত গল্প।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যৎ তাই কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে নির্ভর করছে না। বরং তা নির্ভর করছে আমরা চলচ্চিত্রকে কীভাবে দেখি তার ওপর। যদি চলচ্চিত্রকে কেবল একটি ব্যবসা হিসেবে দেখি, তবে হয়তো কিছু সময়ের জন্য আর্থিক সাফল্য আসবে, কিন্তু একটি জাতীয় চলচ্চিত্র-ঐতিহ্য গড়ে উঠবে না। আর যদি চলচ্চিত্রকে একটি সৃজনশীল শিল্প, সাংস্কৃতিক সম্পদ এবং জাতীয় স্মৃতির ধারক হিসেবে বিবেচনা করি, তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আবারও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন অতীতের গৌরব, বর্তমানের সংকট এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা একই ফ্রেমে ধরা দিয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের, আমরা কি কেবল হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলোর স্মৃতি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি এমন একটি চলচ্চিত্র পরিবেশ গড়ে তুলব, যেখানে আগামী প্রজন্ম আবারও বাংলা চলচ্চিত্র দেখে নিজেদের গল্প, নিজেদের ইতিহাস এবং নিজেদের স্বপ্নকে চিনে নিতে পারবে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি নির্ধারণ করবে না, বাজারও একা নির্ধারণ করবে না। এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আমাদের কল্পনাশক্তি, নীতিনির্ধারণের দূরদর্শিতা, শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সবচেয়ে বড় কথা নিজেদের গল্প বলার সাহস। যে দিন আমরা এই সাহসকে আবারও কেন্দ্রস্থলে ফিরিয়ে আনতে পারব, সেদিনই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের নতুন অধ্যায় শুরু হবে। আমরা এখনো আশাবাদী আমাদের এই হারানো ঐতিহ্য আবার ফিরে এসে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।
লেখক, মাহমুদ সাকী।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিনের শিক্ষক ও সংস্কৃতি কর্মী।

আপনার মতামত লিখুন :