খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের ২০১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী মেহরাব হোসাইন যুক্তরাষ্ট্রের 'ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা'-য় পূর্ণ অর্থায়নসহ (Fully Funded) সরাসরি পিএইচডি প্রোগ্রামে সুযোগ পেয়েছেন।প্রাথমিক পর্যায়ে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্যাখ্যাত হলেও হাল না ছেড়ে তিনি নিজের একাডেমিক ও গবেষণা প্রোফাইল পুনর্গঠনে জোর দেন। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপসহ অফার লেটার লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমা, নানামুখী চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা নিয়ে সম্প্রতি তিনি বিশদ আলোচনা করেছেন।
১. যুক্তরাষ্ট্রে পড়ার স্বপ্নের শুরুটা কীভাবে? মেহরাব হোসাইন: যুক্তরাষ্ট্রে পড়ার ইচ্ছাটা মূলত আমার স্নাতক তৃতীয় বর্ষের শেষের দিকে তৈরি হয়। তখন ফেসবুকে উচ্চশিক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন গ্রুপে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের সফলতার গল্প দেখতাম। তাদের অনেকেই স্কলারশিপ ও ফান্ডিং নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করছিলেন। সেখান থেকেই বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার আগ্রহ জাগে। এরপর বিষয়টি নিয়ে নিজে থেকেই খোঁজখবর নেওয়া ও প্রস্তুতি শুরু করি।
২. ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপের বিষয়টি প্রথম কীভাবে জানতে পারেন? মেহরাব হোসাইন: শুরুতে বিস্তারিত কিছু বুঝতাম না। পরে বিষয়গুলো এক্সপ্লোর করা শুরু করি। তখন জানতে পারি, বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শতভাগ অর্থায়ন নিয়ে পড়াশোনা করা সম্ভব। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উচ্চশিক্ষাবিষয়ক গ্রুপগুলো থেকে এ বিষয়ে অনেক তথ্য পেয়েছি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে পুরো আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়।
৩. বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য নিজের প্রোফাইল কীভাবে প্রস্তুত করেছেন? মেহরাব হোসাইন: প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে আমার সিজিপিএ (CGPA) খুব একটা ভালো ছিল না। পরে যখন বুঝলাম যে বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একাডেমিক ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, তখন পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াই। বিশেষ করে চতুর্থ বর্ষে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি এবং শেষ পর্যন্ত একটি ভালো সিজিপিএ অর্জনে সক্ষম হই। তবে শুধু ভালো সিজিপিএ থাকলেই চলে না; একজন শিক্ষার্থীর অন্যান্য ক্ষেত্রেও দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে গবেষণার অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা, সহশিক্ষা কার্যক্রম (Co-curricular activities) এবং নিজের সুনির্দিষ্ট গবেষণা আগ্রহ। সবকিছুর সম্মিলিত রূপই একটি শক্তিশালী প্রোফাইল তৈরি করে।
৪. আপনার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেমন ছিল? মেহরাব হোসাইন: বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই আমি রোটার্যাক্ট ক্লাব অফ খুলনা ইউনিভার্সিটির (Rotaract Club of Khulna University) সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। একদিকে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা, অন্যদিকে ক্লাবের নানাবিধ সামাজিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম দুটিই সমানতালে সামলাতে হয়েছে। প্রায় চার বছর ক্লাবটির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম এবং চতুর্থ বর্ষে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলো আমাকে স্বাবলম্বী করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পেশাগত নানা দক্ষতা গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
৫. আবেদন প্রক্রিয়াটি একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে সম্পন্ন করেছেন? মেহরাব হোসাইন: শুরুতেই নিজের প্রোফাইল অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় বাছাই করতে হবে। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী যে ভুলটি করে, তা হলো কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক র্যাংকিং দেখে আবেদন করা। কিন্তু প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কিছু শর্ত বা যোগ্যতা (Requirements) থাকে, যা তাদের ওয়েবসাইটে দেওয়া থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে দেখতে হবে সেখানে নিজের গবেষণার আগ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো প্রোগ্রাম আছে কি না। এরপর সংশ্লিষ্ট অধ্যাপকদের গবেষণার ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। যার কাজের সঙ্গে নিজের আগ্রহ মিলবে, তার সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগ তৈরি করে আবেদন করাই শ্রেয়। আমি মোট ১০টির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছিলাম। শুরুতে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করি, তার প্রথম তিনটি থেকেই প্রত্যাখ্যানের (Rejection) বার্তা পাই। কিন্তু হতাশ না হয়ে পরবর্তীতে আরও কয়েকটি জায়গায় আবেদন করি এবং শেষ পর্যন্ত তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পাই।
৬. শুরুতে রিজেকশন পাওয়ার পর মানসিকভাবে কীভাবে নিজেকে সামলেছেন? মেহরাব হোসাইন: শুরুর দিকটা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। প্রথম তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রিজেকশন পেয়ে কিছুটা হতাশ হলেও হাল ছাড়িনি। বরং কোথায় ঘাটতি ছিল এবং কীভাবে নিজের প্রোফাইলকে আরও সমৃদ্ধ করা যায় তা নিয়ে কাজ শুরু করি। এরপর ভুলগুলো সংশোধন করে পুনরায় আবেদন করি। আমার মনে হয়, শুরুতে প্রত্যাশিত ফল না এলেও মনোবল হারানো যাবে না। দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে কাজ চালিয়ে যাওয়াটাই আসল।
৭. অধ্যাপককে আগে থেকে ই-মেইল করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? মেহরাব হোসাইন: অধ্যাপকদের আগে থেকে ই-মেইল করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে সম্ভব হলে যোগাযোগের চেষ্টা করা ভালো। তাদের গবেষণার বিষয় সম্পর্কে জেনে এবং নিজের আগ্রহের কথা জানিয়ে যোগাযোগ করা যায়। এতে গবেষণা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয় এবং যোগাযোগ বজায় থাকে। ৮. SOP ও LOR একটি আবেদনে কতটা ভূমিকা রাখে?
মেহরাব হোসাইন: স্টেটমেন্ট অব পারপাস (SOP) এবং লেটার অব রেকমেন্ডেশন (LOR)—দুটিই একটি আবেদনকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাথমিক যোগ্যতাগুলো পূরণের পর মূলত SOP দেখেই একজন শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্য, গবেষণার আগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মূল্যায়ন করা হয়। SOP লেখার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। এতে নিজের অতীত অভিজ্ঞতা, গবেষণার মূল ক্ষেত্র, কার অধীনে কাজ করতে চান এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সংক্ষেপে ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। তবে সিভিতে থাকা তথ্যই হুবহু SOP-তে লিখে দেওয়া উচিত নয় বরং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কী শিখেছেন এবং তা কীভাবে ভবিষ্যৎ গবেষণায় কাজে লাগবে—তা ফুটিয়ে তোলাই মূল বিষয়। IELTS পরীক্ষা দেওয়ার পরও হাতে দুই-তিন মাস সময় রেখে SOP প্রস্তুত করা উচিত। আমি নিজেও আমার SOP বারবার পর্যালোচনা করেছি এবং শিক্ষকদের মাধ্যমে সংশোধন করিয়ে নিয়েছি।
৯. CGPA, Research নাকি Co-curricular Activities—কোনটি আপনাকে সবচেয়ে এগিয়ে রেখেছে বলে মনে করেন? মেহরাব হোসাইন: একক কোনো একটি বিষয় নয়, বরং সামগ্রিক প্রোফাইলটাই আসল। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের কেবল একটি স্কেলে মূল্যায়ন করে না। তারা সিজিপিএ, গবেষণার অভিজ্ঞতা, প্রকাশনা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমসহ পুরো প্রোফাইলটি সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে। তাই একাডেমিক ফলাফল, গবেষণা, প্রকাশনা ও সহশিক্ষা—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
১০. বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী? মেহরাব হোসাইন: যত দ্রুত সম্ভব উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি শুরু করা উচিত। নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। আর দক্ষতা বিকাশের চমৎকার একটি মাধ্যম হলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই বিভিন্ন ক্লাবিংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা। প্রথম বর্ষ থেকেই ডিবেটিং, স্কিল ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া যায়। তবে কেবল সদস্য হয়ে না থেকে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে। এর পাশাপাশি শিক্ষকদের সাথে গবেষণায় যুক্ত হওয়া, ফেলোশিপ, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ কিংবা ইন্টার্নশিপের সুযোগগুলো কাজে লাগানো দরকার। বিশেষ করে সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে স্কলারশিপ ও ফান্ডিং পাওয়া বেশ প্রতিযোগিতামূলক। তাই অ্যাকাডেমিক ফলাফলের পাশাপাশি মানসম্পন্ন গবেষণার অভিজ্ঞতা ও প্রকাশনা খুবই সহায়ক ভূমিকা রাখে। সর্বোপরি, ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং লক্ষ্য অর্জনে সৎ ও ধারাবাহিক থাকতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :