হুমকি ও মানহানির মামলায় পাঁচ অধ্যক্ষ-সুপারের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম

হুমকি ও মানহানির মামলায় পাঁচ অধ্যক্ষ-সুপারের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ

ফাইল ফটো

ভুয়া শিক্ষক সনদ ও নিয়োগের বিষয়ে অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করার জেরে সাংবাদিক কাজী শরিফুল ইসলামকে হুমকি ও মানহানি করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় পাঁচ অধ্যক্ষ ও সুপারের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। দণ্ডবিধির ৫০০ ও ৫০৬ ধারায় দায়ের করা মামলাটির তদন্তে সাক্ষ্য-প্রমাণ, কাগজপত্র ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা পর্যালোচনা করে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ ঢাকার চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আদালত নং-৯-এ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন রমনা মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) নাজমুল হোসেন। মামলাটি সিআর মামলা নং-৩০৬/২০১৬ (রমনা)।

তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত পাঁচজন হলেন—মোঃ বাকিউল ইসলাম, অধ্যক্ষ, মনতলা ফাজিল মাদ্রাসা; মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ওরফে কামাল উদ্দিন, সুপার, কোচের চর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা; মোঃ এমারত হোসাইন, সুপার, টিকিউ বালিকা মাদ্রাসা; মোঃ এখলাছ উদ্দিন, সুপার, শেখেরগাঁও জে ইউ ফাজিল মাদ্রাসা এবং মোঃ আবু রায়হান ভূঁইয়া, অধ্যক্ষ, চন্দনবাড়ি কামিল মাদ্রাসা।

মামলার বাদী কাজী শরিফুল ইসলাম মনোহরদী উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও পেশায় সাংবাদিক। মামলার অভিযোগে বলা হয়, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও ভুয়া শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে অনুসন্ধান করে সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি তিনি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে অভিযোগ করেন। ভুয়া NTRCA সনদের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (NTRCA) কাছেও আবেদন করেন তিনি।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই শেষে বিভিন্ন সময়ে ২৬ জন ভুয়া NTRCA সনদধারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাদের ইনডেক্স কর্তন ও বেতন বন্ধের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে মনতলা ফাজিল মাদ্রাসার ৮ জন, কোচের চর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার ৮ জন, শেখেরগাঁও জে ইউ ফাজিল মাদ্রাসার ২ জন এবং টিকিউ বালিকা মাদ্রাসার ৮ জন শিক্ষকের বিষয় তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাদীর অভিযোগ, এসব বিষয়ে অনুসন্ধান ও অভিযোগ করার পর অভিযুক্তরা তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন সময়ে হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর সকাল ১১টার দিকে মনোহরদী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের গেটের সামনে তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও প্রচারণা চালানো হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাদীর দাবি, ওই মানববন্ধনের ব্যানার ও বক্তব্যে তাকে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে অর্থ দাবির অভিযোগ তোলা হয়। পরবর্তীতে মানববন্ধনের ভিডিও ও বক্তব্য বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়। এতে তার সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ সকাল ১০টার দিকে ঢাকার রমনা থানাধীন বেইলী রোডে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এলাকায় অভিযুক্তরা তাদের সঙ্গে থাকা লোকজন নিয়ে বাদীর ছবি ব্যবহার করে একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন। সেখানে বাদীর বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া হয় এবং পরে এসব বক্তব্য ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, তদন্তভার গ্রহণের পর ১৫ মে ২০২৬ সকাল ১০টার দিকে বাদীর দেখানো মতে ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। পরে বাদী ও ঘটনার বিষয়ে অবগত সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় তাদের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়। ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনে ঘটনাস্থল এলাকায় বিশ্বস্ত সোর্স নিয়োগ করে প্রকাশ্য ও গোপনীয়ভাবে তদন্তও পরিচালনা করা হয়।

মামলায় বাদীপক্ষের সাক্ষী হিসেবে অঞ্জনা বেগম, মোঃ রাজীব হোসেন ও মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের নাম রয়েছে। এছাড়া নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসেবে মোঃ সেলিম রেজাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থল ও আশপাশে তল্লাশি চালিয়েও জব্দ করার মতো কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। বাদীর কাছ থেকেও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

তদন্তের শেষ পর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, মামলার সার্বিক তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ, কাগজপত্র এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় পাঁচ আসামি—মোঃ বাকিউল ইসলাম, মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ওরফে কামাল উদ্দিন, মোঃ এমারত হোসাইন, মোঃ এখলাছ উদ্দিন এবং মোঃ আবু রায়হান ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৫০০ ও ৫০৬ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যথানিয়মে বাদীকে তদন্তের ফলাফল অবহিত করা হয়েছে। মামলার বিচারকালে বাদী ও সাক্ষীরা বিজ্ঞ আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করবেন। তদন্ত প্রতিবেদনটি দাখিল করেছেন রমনা মডেল থানার সাব-ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) নাজমুল হোসেন, বিপি-৯১১৯২২২৮৮১।

Link copied!