নওগাঁর মান্দায় অনুকূল আবহাওয়ায় পাটের ফলন বৃদ্ধি ও মান ভালো হয়েছে। বাজারে প্রতি মণ পাট সন্তোষজনক দামে বিক্রি হচ্ছে। পাটকাঠি ও আঁশ ছাড়িয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাড়তি আয় হচ্ছে। ভালো ফলন উৎপাদন খরচ কম পাটের দাম সন্তোষজনক সবমিলিয়ে পাট চাষীদের মুখে সোনালী হাসি। চলতি মৌসুমে প্রায় ১ হাজার ৪২০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। উপজেলার মাঠে দেশি, তোষা, মেস্তা ও ভেলিসহ বিভিন্ন ধরনের পাটের আবাদ হয়েছে। কৃষকদের মতে, সাধারণত প্রতি বিঘা জমিতে ৮ থেকে ১০ মণ পাট উৎপাদন হয়। ভালো ফলন হলে কোনো কোনো জমিতে ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত পাট পাওয়া যায়।
কৃষকদের হিসাবে, প্রতি বিঘা জমিতে পাট চাষে খরচ হয় প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ থাকছে। তুলনামূলক কম খরচে ভালো লাভ পাওয়ায় পাট চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। জোতবাজার হাটে সরেজমিনে কথা হয় মান্দা উপজেলার ফতেপুর গ্রামের কৃষক সাইফুল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, পাটে খরচ তুলনামূলক কম। সার-কীটনাশকও বেশি লাগে না। এবার ফলন ভালো হওয়ায় এবং বাজারে দাম ভালো থাকায় পাট চাষে লাভ হচ্ছে। সব খরচ বাদ দিয়ে যে লাভ থাকে, তাতে পাট চাষ করে আমরা সন্তুষ্ট। জোতবাজার এলাকার কৃষক ভুট্টু মিয়া বলেন ৫ ভিসা মাটিতে পাটের চাষ করেছি এতে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে এখান থেকে প্রায় দুই লক্ষ টাকার পাট বিক্রি হবে।
তবে পাট চাষে লাভ থাকলেও জাগ দেওয়া নিয়ে এবার কিছুটা বাড়তি ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকেরা। বর্ষা মৌসুম হলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন খাল-বিল, ডোবা ও জলাশয়ে পানি কম। ফলে পাট কাটার পর জাগ দেওয়ার জন্য অনেক কৃষককে দূরের জলাশয়ে যেতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ও শ্রমিক খাতে বাড়তি খরচ হচ্ছে। এক কৃষক বলেন, পাটের দাম ভালো থাকায় লাভ হচ্ছে। তবে এবার জাগ দেওয়ার পানি নিয়ে সমস্যা হয়েছে। তারপরও পাটের দাম ভালো থাকায় লাভের আশাবাদী। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ জোতবাজার পাটের হাটে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সপ্তাহখানেক আগে ভালো মানের পাটের মণপ্রতি দাম ছিল প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টাকা। বর্তমানে মান ও বাজারভেদে তা প্রায় ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে পাটের দাম কিছুটা কমেছে। তবে কৃষকদের মতে, বর্তমান বাজারদরও অন্যান্য অনেক ফসলের তুলনায় সন্তোষজনক।
কৃষকদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে পাট কেনার সময় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব থাকে। কৃষকেরা সবসময় সরাসরি বড় ক্রেতা বা মোকাম পর্যায়ের ক্রেতার কাছে পাট বিক্রি করতে পারেন না। ফলে মাঝখানে কয়েক ধাপে পাট হাতবদল হয় এবং কৃষক উৎপাদিত পাটের প্রকৃত বাজারমূল্যের পুরো সুবিধা পান না। এরপরেও বর্তমান দর মোটামুটি সন্তোষজনক হলেও ভবিষ্যতে আরও ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে কৃষকদের। রাত ৩টা থেকে শুরু হওয়া জোতবাজারের পাটের হাটে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকেরা নসিমন, ভটভটি, অটো, অটোচার্জার, ভ্যান ও বাইসাইকেলে পাট নিয়ে আসেন। হাটের সড়কজুড়ে তখন পাটের আঁটি ও আঁশের স্তূপ। ক্রেতারা পাটের মান দেখে দরদাম করেন। ভালো মানের পাটের জন্য তুলনামূলক ভালো দাম দেওয়ার চেষ্টা করেন ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় পাট ব্যবসায়ী সুলতান বলেন, পাটের বাজারে চাহিদা আছে। ভালো মানের পাটের দামও তুলনামূলক ভালো। কৃষকেরা পাট নিয়ে আসছেন এবং বেচাকেনাও হচ্ছে। বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ওপর দাম কিছুটা ওঠানামা করে।পাটকে বলা হয় ‘সোনালি আঁশ’। একসময় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই ফসল এখন নতুন সম্ভাবনা নিয়ে ফিরছে কৃষকের মাঠে। পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি তুলনামূলক কম উৎপাদন খরচ ও ভালো বাজারদর কৃষকদের আবারও পাটমুখী করছে।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপঃ পরিচালক (শস্য) খলিলুর রহমান বলেন, পাটের বহুমুখী ব্যবহার ও বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে এই অর্থকরী ফসলের চাষ আরও বাড়ানো সম্ভব। সেচ, সার ও কীটনাশকের ব্যবহার তুলনামূলক কম হওয়ায় পাট চাষে উৎপাদন খরচও কম। এর সঙ্গে ভালো ফলন এবং বর্তমানে প্রতি মণ পাট সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় কৃষকের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি। তাই সোনালি আঁশের এই চাষে দিন দিন বাড়ছে কৃষকের আগ্রহ।কৃষকেরা মনে করছেন, পাটের ন্যায্যমূল্য ধরে রাখা, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো এবং পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলে পাটের আবাদ আরও বাড়বে।

আপনার মতামত লিখুন :