পোশাক রপ্তানিতে বড় পতন, কমেছে সামগ্রিক আয়

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ০৯ জুলাই, ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম

পোশাক রপ্তানিতে বড় পতন, কমেছে সামগ্রিক আয়

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রধান দুই রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় সত্তর শতাংশই এই দুই বাজারে যায়। দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প হিসেবে অপ্রচলিত বাজারগুলোর সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ থাকলেও বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই বাজারেও উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে চার দশমিক ঊনত্রিশ শতাংশ। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি কমেছে তিন দশমিক একত্রিশ শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়েছে দুই দশমিক তেষট্টি শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে এক দশমিক চৌষট্টি শতাংশ।

পুরো অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় হয়েছে আটত্রিশ দশমিক সত্তর বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এই আয় ছিল ঊনচল্লিশ দশমিক পঁয়ত্রিশ বিলিয়ন ডলার।

অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে জাপানে রপ্তানি এক দশমিক আঠারো বিলিয়ন ডলার থেকে কমে এক দশমিক তেরো বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি আটশো চৌদ্দ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে সাতশো ঊনচল্লিশ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ভারতে ছয়শো চুয়াল্লিশ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে হয়েছে পাঁচশো একাত্তর মিলিয়ন ডলার। তুরস্কে রপ্তানি চারশো পঞ্চাশ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে চারশো এক মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।

তবে অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল ব্রাজিল ও চীন। এই দুই দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় সতেরো শতাংশ করে বেড়েছে। যদিও উভয় বাজারেই রপ্তানির পরিমাণ এখনো দুইশো মিলিয়ন ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা কাঠামোগত সমস্যার কারণে অপ্রচলিত বাজারে প্রত্যাশিত হারে রপ্তানি বাড়ছে না। পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব নতুন বাজারগুলোতেও পড়ায় রপ্তানি সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে উঠেছে।

তার ভাষ্য, প্রচলিত বাজারগুলোর মতো অপ্রচলিত বাজারে এখনো শক্তিশালী সংগ্রহ ব্যবস্থা ও ক্রেতাভিত্তিক যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করা কঠিন হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বড় কারখানাগুলো মূলত বৃহৎ পরিসরের অর্ডার পরিচালনায় অভ্যস্ত হলেও অপ্রচলিত বাজারে তুলনামূলক ছোট অর্ডার আসে। এতে উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি আরও বলেন, নতুন বাজারগুলোর সঙ্গে ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনেও নানা জটিলতা রয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার মতো দেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অর্থ লেনদেন সহজ নয়। বাজারভিত্তিক যোগাযোগ জোরদার, ব্যাংকিং সুবিধা উন্নয়ন, শুল্ক প্রতিবন্ধকতা কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো গেলে অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির সম্ভাবনা আরও বাড়বে।

তথ্য বলছে, দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে উনিশ দশমিক এক বিলিয়ন ডলারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রাক্কালে এই প্রবণতা বাজার বৈচিত্র্যকরণের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে।

অন্যদিকে প্রধান কয়েকটি বাজারে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বেড়ে হয়েছে সাত দশমিক চুয়াত্তর বিলিয়ন ডলার। মোট রপ্তানিতে দেশটির অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে বিশ দশমিক এক শতাংশ। যুক্তরাজ্যে রপ্তানি বেড়ে চার দশমিক ঊনচল্লিশ বিলিয়ন ডলার এবং কানাডায় বেড়ে এক দশমিক চৌত্রিশ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা মিলিয়ে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির অংশ এখন পঁয়ত্রিশ শতাংশের বেশি, যা ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি কমার প্রভাব কিছুটা সামাল দিয়েছে।

পণ্যের ধরন অনুযায়ী, নিট পোশাক রপ্তানি কমেছে দুই দশমিক তিপ্পান্ন শতাংশ। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক একষট্টি শতাংশ। ফলে পুরো অর্থবছরজুড়ে ওভেন পোশাক তুলনামূলক ভালো অবস্থানে ছিল।

মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বিশ্ববাজারে চাহিদা নিম্নমুখী। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি এবং বৈশ্বিক শুল্ক প্রতিযোগিতার প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সময়ে ইউরোপের অর্থনৈতিক দুর্বলতা অব্যাহত থাকায় সেখানে রপ্তানি প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। অন্যদিকে চীন ও ভারত আরও আক্রমণাত্মক বাণিজ্য কৌশল গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর ভবিষ্যতে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা হারানোর আশঙ্কাও ইউরোপের অনেক ক্রেতাকে সতর্ক করে তুলেছে। ফলে তারা নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন এবং বিকল্প উৎস থেকেও পণ্য সংগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করছেন।

 

তার মতে, ব্যবসা সহজীকরণ, লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া সরল করা এবং ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণে সরকারের ঘোষিত উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা দূর করে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, শুল্ক প্রতিযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।

Link copied!