হাঁস পালনে ভাগ্য বদল আনন্দ বর্মনের, বছরে আয় ৪-৫ লাখ টাকা

মোঃ নাঈমুজ্জামান নাঈম , নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম

হাঁস পালনে ভাগ্য বদল আনন্দ বর্মনের, বছরে আয় ৪-৫ লাখ টাকা

একসময় নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন আনন্দ চন্দ্র বর্মন। দিন-রাত পরিশ্রম করেও আয় ছিল অনিশ্চিত। তবে প্রায় এক যুগ আগে সেই পেশা ছেড়ে তিনি হাঁস পালন শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে হাঁসের সংখ্যা, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ডিম উৎপাদন ও আয়। বর্তমানে হাঁসের খামারই তাঁর পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। বছরে এ খামার থেকে তাঁর আয় হচ্ছে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা।

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার উসমানপুর ইউনিয়নের নাজিরদীঘি গ্রামের বাসিন্দা আনন্দ চন্দ্র বর্মনের খামারে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২০০ হাঁস রয়েছে। প্রতিদিন খামারের হাঁসগুলোকে দুই বস্তা ফিড, এক বস্তা ধান ও প্রায় পাঁচ বস্তা শামুক খাওয়ানো হয়। নিয়মিত খাবারের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ও টিকাও দিতে হয়।

আনন্দ চন্দ্র বর্মন জানান, তাঁর খামারের হাঁসগুলো বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬৪০টি ডিম দিচ্ছে। কিছুদিন পর উৎপাদন বেড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০টি ডিম হতে পারে বলে তিনি আশা করছেন। বর্তমানে প্রতি হালি হাঁসের ডিম ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগের বছরের তুলনায় চলতি বছর ডিমের দামও ভালো।

তিনি বলেন, “আগে নদীতে মাছ ধরতাম। মাছ ধরে যে আয় হতো, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন ছিল। প্রায় ১০-১২ বছর আগে হাঁস পালন শুরু করি। এখন হাঁস পালন করেই ভালো আছি। খামারে লোকসান হয় না, বছরে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আয় হয়।” পরিবারের বিষয়ে আনন্দ বর্মন জানান, তিন মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। এখন হাঁসের খামার নিয়েই তাঁর ব্যস্ততা।

তিনি জানান, হাঁসের বাচ্চা কেনার পর প্রায় পাঁচ মাস পর্যন্ত নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়। এ সময় খাবার, ওষুধ ও টিকা দেওয়াসহ নানা ধরনের যত্ন নিতে হয়। সাধারণত হাঁসের বয়স পাঁচ মাস হলে ডিম দেওয়া শুরু করে। সঠিকভাবে খাবার ও পরিচর্যা করা গেলে হাঁস প্রায় সারা বছরই ডিম দেয়। আনন্দ চন্দ্র বর্মনের খামারে ‘নাগ-নাগীনি’ জাতের হাঁস রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ জাতের হাঁসের বাচ্চাকে এক মাস বয়সে একটি এবং দুই মাস বয়সে আরেকটি টিকা দিলেই প্রাথমিকভাবে চলে। তবে হাঁস সুস্থ রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া জরুরি।

প্রতিদিন সকাল ৭টার দিকে হাঁসগুলোকে কুনিয়ার হাওরের পানিতে নিয়ে যান আনন্দ বর্মন। সেখানে হাঁসগুলো বিচরণ ও খাবার সংগ্রহের সুযোগ পায়। সন্ধ্যায় সেগুলো আবার বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। খামারের কাজে একজন শ্রমিকও তাঁকে সহযোগিতা করেন।

খামারি জানান, হাঁস পালনে পানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে অতিরিক্ত পানি হলে হাঁস পালন কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে পানির পরিমাণ বেশি বেড়ে গেলে অনেক সময় হাঁস বিক্রি করে দিতে হয়। অন্যদিকে খামার থেকে প্রতিদিনই ব্যবসায়ীরা এসে সরাসরি ডিম কিনে নিয়ে যান, ফলে ডিম বাজারজাত করতে তাঁকে বিশেষ ঝামেলা পোহাতে হয় না।

স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে হাঁস পালন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে হাওর ও জলাশয়সমৃদ্ধ এলাকায় পরিকল্পিতভাবে হাঁস পালন করলে বেকারত্ব কমানোর পাশাপাশি পরিবারের আয় বাড়ানো সম্ভব। তবে হাঁসের জাত নির্বাচন, সুষম খাদ্য, টিকাদান, রোগ প্রতিরোধ ও খামার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে খামারিদের সচেতন থাকা জরুরি।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, হাঁস পালনকে লাভজনক করতে খামারিদের নিয়মিত টিকা দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সুষম খাবার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

স্থানীয়দের মতে, আনন্দ চন্দ্র বর্মনের মতো ছোট পরিসরের উদ্যোক্তারা প্রমাণ করছেন, যথাযথ পরিশ্রম, পরিচর্যা ও পরিকল্পনা থাকলে হাঁস পালনও একটি লাভজনক পেশা হতে পারে। একসময় নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা আনন্দ এখন হাঁসের খামার দিয়েই সংসারের সচ্ছলতা ধরে রেখেছেন।

Link copied!