মান্দায় আউশ চাষে খরচ দ্বিগুণ: দাম তলানিতে, দিশেহারা চাষি

‎ ‎মোঃ রায়হান আলী , মান্দা ‎(নওগাঁ) প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:২২ পিএম

মান্দায় আউশ চাষে খরচ দ্বিগুণ: দাম তলানিতে, দিশেহারা চাষি

সবুজ শ্যামল প্রান্তরজুড়ে এখন পাকা ধানের সোনালি আভা। বাতাসে দুলছে কৃষকের স্বপ্ন। কিন্তু নওগাঁর মান্দা উপজেলার আউশ চাষিদের মনে আজ কোনো আনন্দ নেই। বুকভরা আশা নিয়ে কঠোর পরিশ্রমে ফসল ফলালেও বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য না থাকায় তাদের চোখে-মুখে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মান্দা উপজেলায় মোট ১৩ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যায় ধানের ফলনও হয়েছে বেশ সন্তোষজনক। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। ফলন ভালো হলেও খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ কৃষক।

পরানপুর গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম, হুমায়ুন কবির, মকবুল হোসেন এবং ভারশোঁ ইউনিয়নের বাঁকাপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ও এনামুল জানান, এবার আউশ চাষে শুরু থেকেই গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত টাকা। গত বছরের তুলনায় এ বছর ইউরিয়া, ডিএপি ও পটাশ সারের দাম বেড়েছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দফায় দফায় কীটনাশক প্রয়োগের খরচ। তীব্র গরমের কারণে জমিতে বাড়তি সেচ দিতে হয়েছে, যার ফলে ডিজেল ও বিদ্যুৎচালিত পাম্পের পেছনে খরচ হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ। এছাড়া চড়া মজুরিতে শ্রমিক নিয়ে ধান কাটা ও মাড়াই করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ প্রতি মণে ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ আউশ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। অথচ কৃষকদের দাবি, এক মণ ধান ঘরে তুলতে তাদের যে খরচ হয়েছে, তা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি। কুশুম্বা ইউনিয়নের কৃষক রহমত আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সার, বিষ আর সেচ দিতেই পকেটের সব টাকা শেষ। শ্রমিকের মজুরি এবার আকাশচুম্বী। ভেবেছিলাম ধান বেচে গত বছরের ধারদেনা শোধ করব। কিন্তু বাজারে ৮০০ টাকা মণ ধান বিক্রি করলে তো আসল টাকাই উঠবে না, লাভ তো দূরের কথা।’

আরেক চাষি সুবল চন্দ্র জানান, মহাজন ও এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তিনি তিন বিঘা জমিতে আউশ আবাদ করেছিলেন। এখন বাজারে যে দাম, তাতে লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। ঋণের কিস্তি কীভাবে শোধ করবেন, তা নিয়ে পরিবারে চলছে অশান্তি। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শায়লা শারমিন বলেন, ‘চলতি মৌসুমে মান্দায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে আউশের আবাদ হয়েছে। আমরা কৃষকদের সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতা দিয়েছি, যার কারণে ফলন চমৎকার হয়েছে। তবে বাজারের এই দরপতন সাময়িক হতে পারে। সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হলে কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাবেন বলে আমরা আশা করছি।’

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে ধানের দাম কম। প্রান্তিক চাষিদের বাঁচাতে অবিলম্বে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সরকারি মূল্যে ধান কেনা শুরু করার জোর দাবি জানিয়েছেন মান্দার ভুক্তভোগী আউশ চাষিরা। অন্যথায় আগামীতে তারা আউশ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Link copied!