মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪২ অপরাহ্ন

পাঁচ মিনিট কথা বললে ২০০ টাকা গুণতে হয়

পাঁচ মিনিট কথা বললে ২০০ টাকা গুণতে হয়

মোর্শেদ মারুফ :
স্বজনদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে মাত্র পাঁচ মিনিট কথা বলার জন্য কমপক্ষে ২০০ টাকা গুণতে হয় কারাবন্দিদের ! কারাগারের ভেতরে ও বাইরে দুটি ক্যান্টিন থেকে যে কোনও পণ্য সামগ্রী কিনতে হয় দুই থেকে তিনগুণ বেশি দামে । শুধু তাই নয়, কারাগারের ভেতরে কারাবন্দিরাই গড়ে তুলেছে পাঁচটি মেস। যেসব মেস চালায় বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত দাগি আসামিরা । খুলনা জেলা কারাগারের ভেতরের আরও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য ।

কারাগারের বাইরে ও ভিতরে পরিচালিত ক্যান্টিনে প্রতিটি পণ্যের দাম দ্বিগুণ। কারাগারের বাইরের এই ক্যান্টিনে বন্দি স্বজনদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন আজিজ নামে এক ব্যক্তি । তিনি অভিযোগ করে বলেন, কারাগারে বন্দিদের জন্য খাবার পাঠালে তা পৌঁছাতে পৌঁছাতে মিলিয়ে যায় ।

 

বাইরের কোন দোকান থেকে কিছু কিনে দেওয়া যাবে না, ওদের নিজস্ব (কারা ক্যান্টিন) ক্যান্টিন থেকেই সব কিনতে হবে, কিন্তু সেখানে সব কিছুর দাম অনেক বেশি রাখা হয় । যে বল সাবানের (কাপড় কাচা) গায়ে মূল্য দেওয়া আছে ১৭ টাকা, ওদের কাছে সেই সাবান কিনতে হয় ৫০ টাকায়, ব্রাশের গায়ে মূল্য আছে ২০ টাকা তাদের কাছে কিনতে হয় ৬০ টাকায়, ২০ টাকার স্যান্ডেলের মূল্য ৬০ টাকা, আবার কেউ যদি বাইরে থেকে এসব কিনে দেন তারপরও তাদের দাম দিতে হবে। আবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্যাকেটিং করে কারাগারে পাঠানোর জন্য ব্যাগ প্রতি দিতে হয় ১০০ টাকা । তারা এমন আচরণ করে ‘দিলে দিন, না দিলে না দিন’।

সম্প্রতি কারাগার থেকে জামিনে আশিকুর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বন্দির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারাগারের ভেতরের ক্যান্টিনের সব ভয়াবহ তথ্য। খুলনা কারাগারের জেল সুপার রফিকুল কাদের নিজেই চালান । সকাল-সন্ধ্যা বাইরের বাজার থেকে তিনি কেনাকাটা করার পর মাছ, মাংস, তরিতরকারি ক্যান্টিনে দেন ।

 

ক্যান্টিনের পাশাপাশি কারাগারের ভেতরে গড়ে ওঠা পাঁচটি মেসে বেশি দামে এসব সরবরাহ করেন তিনিসহ তার সিন্ডিকেট সদস্যরা । কারাগারের রান্না করা তরকারি যারা খেতে চান না, তারা টাকা দিয়ে এসব মেস থেকে কিনে খান । কয়েকজন কারাবন্দি মিলে গড়ে তুলেছে এসব মেস। মেস পাঁচটির দায়িত্বে আছেন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিরা ।

তারা ভেতরের ক্যান্টিন থেকে দ্বিগুণ দামে সবজিসহ মাছ মাংস কিনে এসব মেসে রান্না করে অতিরিক্ত দামে বন্দিদের কাছে বিক্রি করে। ওই মেসে প্রতি প্লেট গরুর মাংস ৫০০ টাকা, ডিম আলুর ডাল ৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগির মাংস দেড়শ থেকে ২০০ টাকা, দুই টুকরো খাসির মাংস ৩০০ টাকা, প্রতি প্লেট সবজি ১০/২০ টাকা, প্রতি পিস পরোটা ১৫ টাকা, প্রতি বাটি পাতলা ডাল ১৫ টাকায় বিক্রি হয় ।

 

কারাগারের ভেতরে এভাবে মেস করে রান্না ও বিক্রির নিয়ম না থাকলেও সম্প্রতি কারামুক্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারাগারের ভেতরের মেসগুলো পরিচালনা করেন প্রত্যেকেই বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দি। তারা জানান, কারাগারের ভেতরের ক্যান্টিনে এক শলাকা ডার্বি সিগারেট বিক্রি হয় ১২ টাকায়, একটা পান ১০ টাকা। এমনিভাবে যে কোনও খাদ্য সামগ্রী প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য দ্বিগুণ-তিনগুন বেশি টাকা গুনতে হয় কারাবন্দিদের ।

অন্যদিকে, কারাবন্দিরা কারাগার থেকে মোবাইলে স্বজনদের সাথে কথা বলার সুযোগ পায় সপ্তাহে একবার । কিন্তু সেখানেও অনিয়মের শেষ নেই । ৫ মিনিট কথা বলার জন্য ৫ টাকার জায়গায় কারাবন্দিদের দিতে হয় কমপক্ষে ২০০ টাকা । সম্প্রতি জামিনের নামে কারাবন্দি সুমনের পরিবারের কাছ থেকে কৌশলে লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠে খুলনা জেলা কারাগারের জেল সুপার রফিকুল কাদেরের বিরুদ্ধে ।

 

এ বিষয়ে সত্যতা জানতে জেলা কারাগারের জেল সুপার রফিকুল কাদেরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব অনিয়মের অভিযোগ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন ছোটো-খাটো দু-একটা ভুল থাকতেই পারে তবে আমি মানুষ তো ফেরেশতা না আমার ভুল হতেই পারে ।

 

পুর্বের কর্মস্থলে যত ঘটনা :
ফেনীর জেলা কারাগারের সুপার রফিকুল কাদেরকে প্রত্যাহার করে ঢাকায় কারা অধিদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে । ৬ ফেব্রুয়ারি কারা মহাপরিদর্শকের (আইজি প্রিজন) পক্ষে অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্ণেল মোঃ আবরার হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশে বলা হয়েছে, কর্মমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে । এ ঘটনায় ফেনীতে তোলপাড় শুরু হয়েছে ।

 

একাধিক সূত্রে জানা যায়, ফেনী জেলা যুবলীগের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক সাখাওয়াত হোসেন ভূঞাকে মিথ্যা মামলায় পুলিশ গ্রেফতার করে জেলে প্রেরণ করে। কারাগারে থাকাকালীন তাদেরকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় ও সাধারণ ওয়ার্ডের পরিবর্তে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের জন্য নির্ধারিত সেলে রাখা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রসচিবের (সেবা সুরক্ষা বিভাগ) কাছে এ ব্যাপারে আরজু ও সাখাওয়াত এ ব্যাপারে অভিযোগ করেন ।

 

লিখিত অভিযোগে তারা বলেন, তাঁদের ফেনী কারাগারে নিরাপত্তা সেলের ৩ নম্বর কক্ষে রাখা হয়েছে এবং সাংসদের লোকজন সেখানে ঢুকে তাঁদের হুমকি দিয়েছেন। জানা যায়, সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারী তার দেহরক্ষী সাহাবুদ্দিন ও ফুলগাজীর আনন্দপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হারুন মজুমদারকে নিয়ে কারাগারের ভেতরে গেছেন । যুবলীগের দুই নেতা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগে জানান, সেলে প্রবেশ করেন হারুন মজুমদার ও সাহাবুদ্দিন । তাঁরা তাঁদের জিজ্ঞেস করেন, ‘তোদের মামলা কয়টি? তোরা কোনো মামলায় জামিন করাবি নাম। জামিন করালে জেলখানা থেকে বের হওয়ার পর তোদের একরাম চেয়ারম্যানের মতো পুড়িয়ে হত্যা করা হবেম।’

 

এস আলম সবুজ এবং ফেনী সদর থানার উপপরিদর্শক নজরুল ইসলাম সেলের ৩ নম্বর কক্ষে ঢুকে সাখাওয়াতকে হুমকি দিয়ে বলেন, কারাগার থেকে বের হয়ে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হবে ।

 

এ ঘটনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে, সাংসদ নিজাম হাজারীকে ভবিষ্যতে কারাবিধি সুনির্দিষ্টভাবে অনুসরণ করে কারাগার পরিদর্শনের জন্য ‘পরামর্শ’ দিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নির্দেশ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে, ফেনী কারাগারের জ্যেষ্ঠ সুপার রফিকুল কাদেরকে ভবিষ্যতে কারাবিধি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করতে ‘সতর্ক’ করে মন্ত্রণালয় ।

 

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |