মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:১৯ অপরাহ্ন

টোকাইদের পাশে দাঁড়ান

টোকাইদের পাশে দাঁড়ান

মো. আব্দুল মান্নান : বহু কষ্টময় জীবন পার করছে টোকাই, ভিক্ষুক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। তাদের পাশে দাঁড়ান। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে বরং সমাজের বিত্তবান ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদেরও তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। দৈনন্দিন চলাফেরায় এ ধরনের নানা পেশার মানুষের সাথে আমাদের দেখা হয়, কথা হয়। জানা যায় তারা কষ্টে আছেন। তাদের কষ্টের কথা শুনলে কষ্ট লাগে।

রবিবার (৯ জুলাই) ময়মনসিংহের ফুলপুর পৌরসভায় শেরপুর রোড মোড়ে বাইতুন নূর জামে মসজিদে ফজরের নামাজ আদায়ের পর বের হয়েছিলাম একটু ঘুরতে। ভাষা সৈনিক এম শামসুল হক চত্বর বা শেরপুর রোড মোড়ে যাওয়ার পর দেখা হয় বেশ কয়েকজন টোকাইয়ের সাথে। তারা বাসস্ট্যান্ড ও আমুয়াকান্দা ব্রিজ এলাকাসহ বিভিন্ন সড়কে, চিপাচাপায়, দোকানের সামনে, ড্রেনে ও বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা খালি বোতল, কার্টুন, কাগজ ইত্যাদি টোকায়। ময়লা আবর্জনার স্তূপ থেকে নিজ হাত দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করে কুড়িয়ে তুলেন বোতল, ভাল ভাল কাগজ ও কার্টুন জাতীয় বস্তু। সপ্তাহব্যাপী টুকিয়ে এগুলো জমা করেন। তারপর ভাঙারীর দোকানে বিক্রি করে চলে তাদের জীবন। তাদের সম্বন্ধে জানতে ইচ্ছে হয়।

পরে সকালে হাঁটার সময় একটু এগিয়ে গিয়ে কথা বললাম কয়েকজনের সাথে। এতে উঠে আসে টোকাইদের দুঃখ গাঁথা কষ্টময় জীবন কাহিনী। আমুয়াকান্দার আনোয়ারা বেগম বলেন, বাবা, আমার দিন চলে না। বহু কষ্ট করে চলতে হয়। একেকদিন একেক এলাকায় যাই। কাগজ, কার্টুন ও বোতল টোকাই। পরে এগুলো বিক্রি করে যা হয় তা দিয়েই চলে আমাদের সংসার। তালতলা এলাকার বৃদ্ধা অসুস্থ রাজিয়ার কথা শুনে চোখের জল ছলছল করে ওঠে। তিনি বলেন, বাবা, আমার স্বামী নাই।

একটা ছেরা থাইক্যাও নাই। আমার খোঁজ খবর লয় না। আমি ডায়াবেটিস রোগী। ওষুধ লাগে। পথ্য লাগে। কে দেয়? কেউ দেয় না। আমাদের খবর কেউ নেয় না। এজন্য অপারগ অইয়া টোকাইয়ের কাজ করি। এই অসুখ লইয়াই ফরতেক দিন সহালে টুহাইবার আয়ি। মাইনষে আরসি কোলা, সেভেন আপ, কোক, টাইগার, স্প্রাইট, মাম পানি, কিনলে, ফ্রেশ ইত্যাদি পানি খাইয়া যেসব বোতল ফালাইয়া দেয় এইগুলো টুহাই।

পরে দেবলের দোহানো নিয়া বেচি। বোতল ২০ টেহা সের, আর কার্টুন কাগজ ১০ টেহা সের দেয়। প্রায় একই ধরনের কথা বলেন জহুরা নামে আরেকজন টোকাই মহিলা। দিউ গ্রামের মনোয়ারা বলেন, এতে সপ্তাহে আড়াই শ থেকে তিনশ টেহা পাই। এডি দিয়া ওষুধ কিনি, খাই, চলি। আমার কুনু লতা সন্তান নাই। আমার প্রতি আপনেরা একটু দয়া দৃষ্টি দিবাইন।

এসময় সাহা পাড়ার দুইজন অল্প বয়সী ছেলে সুব্রত ও জনন্তকেও থানা রোডের মাথায় টোকাইয়ের কাজ করতে দেখা গেছে। তারা খুব অসহায়। সকালে উঠে ওদের পড়তে বসার কথা ছিল। কিন্তু অভাব তাদেরকে এ পথে নামিয়ে এনেছে। পড়ায় তারা মন দিতে পারছে না অর্থাভাবে। শুধু তাই নয়, এরকমভাবে রয়েছে আমাদের সমাজে ভিক্ষুক ও মধ্যবিত্ত অভাবী। সপ্তাহের একেক দিন একেক ভিক্ষুকরা এলাকায় যায় ভিক্ষা করতে।

ফুলপুর পৌরসভার পুরাতন ডাকবাংলা এলাকায় শুক্রবারে আসে। তাদের সাথে কথা বলেও জানা যায় দুঃখ, দুঃখ আর শুধু দুঃখের গল্প। প্রায় প্রত্যেকটি লোকের দিন যাচ্ছে কষ্ট ক্লিষ্টে। জরিপ চালালে দেখা যাবে টোকাই এবং ভিক্ষুকদের চেয়েও কষ্টে আছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা। তাদের অনেকেই এবার কুরবানী করতে পারেননি। অনেকেই জমি বিক্রি করে করে বা ব্যবসায় লস দিয়ে দিয়ে ক্রমান্বয়ে নিঃস্বের দিকে যাচ্ছে।

এ দুঃখ তারা কারো সাথে না পারে কইতে না পারে সইতে। এমন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন তারা। এ ধরনের অসহায় ও অভাবীদের সাহায্য সহযোগিতা করতে অনুপ্রাণিত করেছে ইসলাম। তাদেরকে খুঁজে বের করে দান করা তাদের পাশে দাঁড়ানো উত্তম ইবাদত। সূরা বাকারার ২৭৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা নিজেদের ধন-সম্পদ রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে তাদের প্রতিদান তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তাগ্রস্তও হবে না।’

হজরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘সর্বোত্তম আমল হচ্ছে একজন মুমিনের মনে খুশি নিয়ে আসা। তার লজ্জাস্থান আবৃত করার ব্যবস্থা করা, তার ক্ষুধা দূর করা কিংবা তার কোনো প্রয়োজন পূরণ করা।’

(আল-মুজাম আত-তাবারানি : ৫/২০২)। যাকাত গ্রহণের উপযুক্তদের মধ্যে সবাই সমপর্যায়ের নয়; বরং তাদের স্তরভেদ রয়েছে। বিভিন্ন আলেম বলেছেন, যাকাতদাতার জন্য মুস্তাহাব হচ্ছে নিরুপায় ব্যক্তিকে অন্যান্য অভাবী ব্যক্তিদের উপর প্রাধান্য দেওয়া। (আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যা : ২৩/৩০৩) কাজেই সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের এসব অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিৎ। আল্লাহ তায়ালা তাওফীক দান করুক।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |