মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ন
মোঃ রহমত উল্যাহ : জামালপুর জেলা কারাগারের জেলার হিসেবে কর্মরত আছেন মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার দৌলতপুর কৃতিসন্তান আবু ফাতাহ। কারাগার থেকে সাজা শেষে যেসকল বন্দী বের হন তাদের মুখে আবু ফাতাহর প্রশংসা থাকবেই। আবু ফাতাহর পিতা ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পিতার চাকুরির সুবাধে তারা নারায়ণগঞ্জ সদরের ফতুল্লায় চলে আসেন এবং সরকারী তোলারাম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৫ সালে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে ১৯৯৭ সালে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
এরপর চট্টগ্রাম ও যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ডেপুটি জেলারের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে জেলার হিসেবে পদোন্নতি পান এবং পিরোজপুর জেলা কারাগারের জেলার হিসেবে যোগদান করেন। এরপর শরিয়তপুর, টাঙ্গাইল, লক্ষ্মীপুর, ঝিনাইদহ, হবিগঞ্জ ও ফেনী জেলা কারাগার, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার, খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারে জেলারের দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ জামালপুর জেলা কারাগারের জেলার হিসেবে কর্মরত আছেন। জামালপুরে এই প্রতিবেদকের সাথে পরিচয় হয় জেলার আবু ফাতাহর। আলাপচারিতায় উঠে আসে আবু ফাতাহর কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক। পাঠকদের জন্য আলাপাচারিতার উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরা হল।
প্রতিদিনের কাগজ : এই পেশায় কেন?
আবু ফাতাহ : ছোটবেলা থেকে পুলিশ বা বিভিন্ন বাহিনীর ইউনিফর্ম এর প্রতি একটা আকর্ষণ ছিলো। সেনাবাহিনীতে পরীক্ষা দিয়েছি, হয়নি। পরে স্নাতকোত্তর শেষ করে ডেপুটি জেলার জন্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি।
প্রতিদিনের কাগজ : আপনার পিতা-মাতার স্বপ্ন কি ছিলো? আপনকে কি দেখতে চেয়েছেন তারা?
আবু ফাতাহ : বাবা চেয়ছিলেন ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হই।
প্রতিদিনের কাগজ : বন্দীদের নিয়ে কাজ করতে কেমন লাগে?
আবু ফাতাহ : তাদের নিয়ে কাজ করতে আমার ভালো লাগে।
প্রতিদিনের কাগজ : কেন?
আবু ফাতাহ : কারণ তারা তাদের ভূল বা অপরাধের জন্য শাস্তিস্বরূপ কারাগারে। আমি তাদের সংশোধনের জন্য বুঝাতে পারতেছি। তাদের ভালো পথে আনার চেষ্টা করতে পারতেছি। তাই নিজের কাছে ভালো লাগে।
প্রতিদিনের কাগজ : দায়িত্বকালীন সময়ে প্রথম কবে ফাঁসির আদেশ কার্যকর করেছিলেন দিয়েছেন এবং কোথায়?
আবু ফাতাহ : ১৯৯৮ সালে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে এক রাতে ২ জন হত্যা মামলার আসামীর ফাঁসি কার্যকর হয়। আমি ডেপুটি জেলার হিসেবে সকল প্রস্তুতি করেছি।
প্রতিদিনের কাগজ : প্রথম ফাঁসি কার্যকরের সময়ের বিশেষ কোনো ঘটনা আছে?
আবু ফাতাহ : হ্যা, সন্ধ্যার সময় যখন প্রথমজনকে ইমামসহ তওবা পড়াতে গেলাম। তাকে তার ফাঁসি কার্যকর সম্পর্কে জানালাম। সে বলতেছে- স্যার আমি নির্দোষ, আমাকে বিনা অপরাধে ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে। যখন তাকে রাতে ফাঁসির মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সে তখনও খুব চিৎকার করে বলতেছিলো- আমি নির্দোষ, আমাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিদিনের কাগজ : এ পর্যন্ত কতজনের ফাঁসি কার্যকরের দায়িত্ব পালন করেছেন?
আবু ফাতাহ : ১০-১২ জনের।
প্রতিদিনের কাগজ : যেসকল বন্দী কারাগার থেকে সাজা শেষে বের হয়, তারা আপনার প্রশংসা করে কেন?
আবু ফাতাহ : কেন প্রশংসা করে জানি না। তবে, আমি চেষ্টা করি আমার কারাগারের বন্দীদের সমস্যাগুলো শুনতে এবং তাদের সাথে সোহার্দপূর্ণ ব্যবহার করতে।
প্রতিদিনের কাগজ : কারাগারে কোনো বন্দীর সংশোধনের কোনো বিশেষ ঘটনা বলুন, যা আপনার এখনো মনে পড়ে।
আবু ফাতাহ : ১৯৯৯ সালে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে ডাবল মার্ডারের এক আসামীর ফাঁসির আদেশ হয়। পরে আপিলে যাবজ্জীবন সাজা হয়। পরে সে নিজেকে সংশোধন করে নেয়। নিয়মিত নামাজ পড়া শুরু করে। ১৪ বছর পরে সে রাষ্ট্রপতির আদেশে ক্ষমা পেয়ে সাজা থেকে মুক্ত হয়ে বের হয় এবং তার বাড়ির সামনে একটি দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করে। একদিন সে চট্টগ্রামে গিয়ে আমার সাথে দেখা করে এবং তাকে ভালো পথে ফিরে আসার জন্য আমার দেওয়া পরামর্শগুলোর জন্য কৃতজ্ঞতা জানায়।
প্রতিদিনের কাগজ : আপনার কর্মজীবনে কারাগারে কোনো বেদনাদায়ক ঘটনা বলুন।
আবু ফাতাহ : জামালপুরের এক নারী স্বামীর সাথে রাগ করে তার ৬ মাসের বাচ্চাকে আছাড় দিয়ে হত্যা করে। স্ত্রী শ্বাশুড়ির বিরুদ্ধে মামলা করে স্বামী। কারাগারে তারা মা-মেয়ে ছিলেন। সন্তান হত্যার পর মাও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং জামালপুর কারাগারে কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পরে তাকে ময়মনসিংহ কারাগারে স্থানান্তর করা হয় এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে জানতে পারলাম সে ময়মনসিংহে আত্মহত্যা করেছে। জামালপুর কারাগারে থাকতে একদিন তাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম, সন্তানকে কেন মারলে? সে বলে স্বামীর নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে কি করেছি নিজেও জানি না। শিশু সন্তানকে আছাড় দিয়ে হত্যার ওই ঘটনা আমাকে আজও শিহরিত করে।
প্রতিদিনের কাগজ : অপরাধীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আপনার উপলব্ধি থেকে পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
আবু ফাতাহ : পাঠকসহ সকল মা-বাবাকে বলবো, সন্তানরা কার সাথে মিশে খোঁজ খবর রাখুন। অন্তত রাতের খাবারটা সন্তানসহ পরিবারের সবাই একসাথে খান।