মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ন

মুক্তাগাছায় মেয়র জামাতাসহ ৩০ জনের নামে হত্যা মামলা

মুক্তাগাছায় মেয়র জামাতাসহ ৩০ জনের নামে হত্যা মামলা

মুক্তাগাছায় মেয়র জামাতাসহ ৩০ জনের নামে হত্যা মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলায় যুবলীগ কর্মী আসাদুজ্জামান হত্যার ঘটনায় মুক্তাগাছা পৌরসভার মেয়র মো. বিল্লাল হোসেন সরকারের জামাতা মাহবুবুল আলম ওরফে মনিসহ ৩০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে।

নিহত যুবলীগ কর্মী আসাদুজ্জামানের ছেলে তাইব হাসান বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

বৃহস্পতিবার (৩১ আগস্ট) বেলা তিনটায় ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে মুক্তাগাছা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাই আকন্দ এ তথ্য জানান।

সংবাদ সম্মেলনে আবদুল হাই আকন্দ বলেন, যুবলীগ কর্মীকে হত্যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ হাতে না থাকায় আইনজীবীর পরামর্শে মামলায় আসামি করা যায়নি।

তিনি বলেন, প্রতিমন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতায় মুক্তাগাছায় ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছেন বিল্লাল হোসেন সরকার ও মাহবুবুল আলম। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার উদ্দেশ্যে নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এবং ২০২১ সালে ৬ জুলাই মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক এ এইচ এম সালেকিন মামুনকে পিটিয়ে আহত করেন মেয়র জামাতা মাহবুবুল আলম ওরফে মনিসহ কয়েকজন। এ ঘটনায় চিকিৎসক এ এইচ এম সালেকিন মামুন থানায় মামলাও দায়ের করেন। পরে মুক্তাগাছা থানার তৎকালীন ওসি দুলাল আকন্দ ও ডিবি পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে মেয়র জামাতা মাহবুবুল আলম মনিকে আটক করে কারাগারে পাঠান। চিকিৎসককে পেটানোর ঘটনা সকল টেলিভিশন, প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়া প্রচার হয়। ৭ দিন কারাবাসের পর জামিনে বের হয় চিকিৎসককে সালেকিন মামুনকে মামলা তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করেন এবং নির্যাতনের ঘটনাটি মিমাংসার প্রস্তাব দেন। চিকিৎসক রাজি না হওয়ায় তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরে চিকিৎসক প্রাণের ভয়ে মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলী হয়ে চলে আসেন।

আসাদুজ্জামানকে হত্যার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আবদুল হাই আকন্দ আরও বলেন, তাঁর হাত কুপিয়ে চারটি অংশ করা হয়। পা কুপিয়ে পাঁচটি অংশ করে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কেউ এমন নির্মমভাবে খুন করতে পারে এমন আগে কখনো দেখেননি।

স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার দাবি করে সংবাদ সম্মেলনে নিহত আসাদুজ্জামানের স্ত্রী আছিয়া খানমও বক্তব্য দেন। এসময় উপস্থিত মুক্তাগাছা শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জহিরুল আমিন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ ঘোষ, সাবেক প্রচার সম্পাদক মো. তারেক উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, মুক্তাগাছা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দুটি পক্ষ। একটি পক্ষের নেতৃত্বে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। তাঁর পক্ষে আছেন মুক্তাগাছা পৌরসভার মেয়র বিল্লাল হোসেন সরকার ও বিল্লাল হোসেন সরকারের জামাতা মাহবুবুল আলম ওরফে মনি। অপর একটি অংশের নেতৃত্বে আছেন মুক্তাগাছা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাই আকন্দসহ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক একাধিক নেতা।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, আওয়ামী লীগের এ দুটি পক্ষের বিরোধের জের ধরে আধিপত্য বিস্তারের জন্য প্রায় মারামারির ঘটনা ঘটছে মুক্তাগাছায়। কয়েক মাসের মধ্যে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি অন্তত পাঁচটি মামলা হয়েছে। নিহত যুবলীগ কমী আসাদুজ্জামান অন্তত চারটি মামলার আসামি ছিলেন।

গত সোমবার (২৮ আগস্ট) রাত নয়টার দিকে মুক্তাগাছা পৌর শহরের আটানি বাজার এলাকায় একটি চায়ের দোকানে কুপিয়ে হত্যা করা হয় আসাদুজ্জামানকে। অভিযোগ ওঠে, মুক্তাগাছায় আওয়ামী লীগের বিরোধের জের হিসেবেই আসাদুজ্জামানকে হত্যা করা হয়।

অভিযোগের ব্যাপারে কথা বলতে মুক্তাগাছা পৌরসভার মেয়র বিল্লাল হোসেন ও জামাতা মাহবুবুল আলমের মুঠোফোনে ফোন করা হলেও তাঁরা ফোন ধরেননি। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, ‘এসব অভিযোগ মিথ্যা। আমি যত দূর জানি, পারিবারিক কারণে আসাদুজ্জামানকে হত্যা করা হয়েছে। এ বিষয় নিয়ে অযথাই মিথ্যাচার করে রাজনৈতিক ফায়দা আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে বৃহস্পতিবার রাতে মুক্তাগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মজিদ বলেন, মামলার এজাহারে কিছু ভুল পাওয়া গেছে। বাদীকে ভুলগুলো সংশোধন করে দিতে বলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকের উপর হামলার ঘটনার মামলাটি বিচারাধীন আছে। মনির নামে চার্জশীট হয়েছে কি না জানতে চাইলে ‘মন্ত্রী মহোদয় আসছেন, পরে কথা বলবো’ বলে ফোনটি কেটে দেন।

চিকিৎসকের উপর হামলা ও পুলিশের যত ঘটনাঃ
চিকিৎসকের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এসআই আমিনুল ইসলাম। তিনি এবং তৎকালীন ওসি মাহমুদুল হাসান, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাহাঙ্গির আলম মামলাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না করে সাবেক উপজেলা ছাত্রদলের সহ-সভপতি ও বর্তমান যুবলীগের সভপতি মেয়র জামাতা মাহবুবুল আলম ওরফে মনিকে চিকিৎসকের মামলা থেকে অব্যাহতি দেন এবং কয়েকজনের নামে চার্জশীট দাখিল করেন।

এ বিষয়ে চিকিৎসকের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আমিনুল ইসলাম জানান, ডাক্তার সালেকিন মামুন হামলার সাথে মনি জড়িত, একথা বলে নি। তদন্তকালে স্বাক্ষীরাও বলে নি। এ কারণে মনির নাম বাদ দিয়ে অন্য আসামীদে নামে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করি। সিসিটিভি ফুটেজে মনিকে হামলা করতে দেখা যায়, এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নিরব থাকেন। আপনার মুক্তগাছা থানা কেন প্রিয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার পরিবার মুক্তাগাছায় থাকে, সেই হিসেবে প্রিয় থানা। তবে এখান থেকে শেরপুরে বদলী হয়েছি। এখন আবার ময়মনসিংহ এসেছি বদলী হয়ে।

মুক্তাগাছা থানার তৎকালীন ওসি মাহমুদুল হাসান জানান, ডাক্তার মামুন সাহেবের উপর হামলার ঘটনায় মনির সম্পৃক্ততার সত্যতা না পাওয়ায় উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেছি।

মুক্তাগাছা থানার তৎকালীন আরেক ওসি মোহাম্মদ দুলাল আকন্দ জানান, ডাক্তার সালেকিন মামুনের উপর হামলার ঘটনায় উধ্বর্তন পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশে তাৎক্ষনিক মনিকে গ্রেফতার করে পরদিন বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। তিনি আরও বলেন, তারপরেই আমাকে এখান থেকে সিআইডিতে বদলী করা হয়।

মামলার বাদী ডাঃ সালেকিন মামুন জানান, মনি আমার উপর সরকারী হাসপাতালে এসে হামলা চালায়। আমি মনিকে আসামী করে মামলা দায়ের করি। কিন্তু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মনির নাম বাদ দিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে আমাকে কোনো ফলাফল জানানো হয় নি। যতটুকু শুনেছি এসআই আমিনুল তাদের খুব কাছের লোক। পরে মনিকে কেন্দ্রীয় যুবলীগের নির্দেশে ঘটনার সত্যতা থাকায় জেলা যুবলীগ মামলা হওয়ার আগেই তাকে বহিষ্কার করেন জেলার নেতারা।

মুক্তাগাছার আওয়ামী লীগ নেতা তাজুল জানান, এসআই আমিনুল মেয়র ও তার জামাতার একান্ত কাছের লোক। তাকে দিয়ে নিরীহ মানুষদের হয়রানি করায় মেয়র ও তার জামাতা। এসবের পেছনে কলকাঠি নাড়ায় ক্ষমতাধর এক ব্যক্তি। তার নির্দেশে মনি খুন ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে যায়।

মুক্তাগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ ঘোষ জানান, মনি জমি দখল, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, রাজনৈতিক গ্রুপিং, খুন-খারাপি, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন, থানা বসে দালালি, প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানিসহ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চলেছে।

মুক্তাগাছা শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জহিরুল আমিন বলেন, তৎকালীন ওসি মোঃ দুলাল আকন্দ চিকিৎসকের উপর হামলার মূল হোতা মনিকে গ্রেফতার করার কারণে সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ তাকে সিআইডিতে বদলী করান।

তিনি আরও বলেন, ওসি মোহাম্মদ দুলাল আকন্দ ছিল মুক্তাগাছার অপরাধীদের আতঙ্ক। তিনি সবসময় মাদক-সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে কঠোর ভূমিকা পালন করেন। মেয়র ও তার জামাতা মনির ষড়যন্ত্রের কারণেই ওসি দুলাল আকন্দসহ ৫ বছরে ৭ জন ওসির বদলী হয়েছে।

চিকিৎসকের উপর হামলার ঘটনায় মামলা থেকে মেয়র জামাতা মাহবুবুল আলম ওরফে মনিকে অব্যাহতি দিয়ে চার্জশীট দাখিল করায় এ বিষয়ে পুলিশের উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ পদক্ষেপ দাবী করেন ময়মনসিংহের চিকিৎসক নেতারা।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |