বিবিসির প্রভাবশালী নারীর তালিকায় কুড়িগ্রামের রিকতা আখতার বানু। সম্প্রতি বিবিসির ২০২৪ সালের জন্য বিশ্বের ১০০ জন অনুপ্রেরণাদায়ী ও প্রভাবশালী নারীর তালিকায় একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে তাঁর নাম এসেছে। গত ১৫ বছরে নানান সমস্যা মোকাবেলা করে রিকতা আখতার বানু বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়টি চালিয়ে যাচ্ছেন।
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স রিকতা আখতার বানু। তাঁর মেয়ে তানভীন দৃষ্টি মনি বাকপ্রতিবন্ধী। ২০০৮ সালে উপজেলার রমনায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়েকে ভর্তি করিয়ে দিলে শিক্ষকরা বিদ্যালয় থেকে বের করে দেন। সেই বেদনা থেকেই প্রতিবন্ধী শিশুদের পড়ালেখা করানোর জন্য গড়ে তোলেন স্কুল। নাম দেন রিকতা আখতার বানু (লুৎফা) বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জানতে চাইলে রিকতা আখতার বানু প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, আমার এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়েটা বাকপ্রতিবন্ধী। ২০০৮ সালে স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়েকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পরে বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতিবন্ধী শিশুকে পড়াবে না বলে স্কুল থেকে বের করে দেন। অনেক অনুরোধ করেও আর আমার মেয়েকে বিদ্যালয়ে পড়ানোর অনুমতি পাইনি। এদিকে আমার মেয়ের সাথের শিশুরা বিদ্যালয়ে যাওয়া দেখে সে কান্নাকাটি কারতো। নিজেই নিজের হাত-পায়ে কামড় দিতো। পরে মেয়ে ও সমাজের অন্যান্য প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য স্কুল চালু করি।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয় শুরুর প্রথম বছরে উপজেলার ৬৩ জন প্রতিবন্ধী শিশু ভর্তি হয়। একাজে আমার স্বামী তাঁর ২৬ শতক জমি দান করেন। ওই জমিতে দোচালা টিনের ঘর নির্মাণ করে বিদ্যালয় শুরু করি। কিন্তু বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় শিক্ষক পাওয়া। এসব প্রতিবন্ধী শিশুদের কেউ পড়াতে চাইতো না। পরে আমার ব্যাকুলতা দেখে আমার স্বামীর ছোট ভাই পড়াতে রাজী হন। একে একে আরও চারজন শিক্ষক নিয়ে বিদ্যালয় শুরু করি। বর্তমানে এই প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ২৯৪ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছেন।
সরেজমিনে মঙ্গলবার চিলমারী উপজেলায় রিকতা আখতার বানু বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ২১ জন শিক্ষক শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নানা কৌশলে শেখাচ্ছেন পড়ালেখা। এছাড়াও শিশুদের শারিরিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে ফেসিয়াল মাসাজসহ নানা রকম ব্যায়াম করাচ্ছেন। এভাবেই ২৯৪ জন প্রতিবন্ধী শিশু ও তাদের অভিভাবকদের ভরসার স্থান হয়ে উঠেছেন রিকতা আখতার ও তাঁর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়।
শুরুর দিকে রিকতা আখতার বানু সংসারের খরচ বাঁচিয়ে এসব শিশুদের জন্য নাসতার ব্যবস্থা করতেন। সম্প্রতি ২০২০ সালে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষক-কর্মকচারীরাও রিকতা আখতারকে শিশুদের নাস্তার খরচে কিছুটা সহযোগিতা করেন।
বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহীন শাহ বলেন, এখনো তাকে সমাজে হেয় দৃষ্টিতে দেখা হয়। তবে এই নিয়ে তাঁর মনে দুঃখ নেই। এই বিদ্যালয়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের শিশুরা পরালেখা করে। কেউ কেউ পাঁচ ছয় কিলোমিটার দূর থেকে পড়তে আসেন। তাদের আনা নেওয়ার জন্য জন্য তিনটি ভ্যান গাড়ী রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এসব বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য খেলার সামগ্রী এবং আরো কিছু সরঞ্জাম দরকার। এখানে বিশেষ ধরনের শিক্ষা দেওয়া হলেও এদের একীভূত শিক্ষার ব্যবস্থা না করলে সমাজের মূলধারায় জায়গা করে নিতে সমস্যা হবে। তাই কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি জরুরি।
বিশ্বের ১০০ জন অনুপ্রেরণাদায়ী ও প্রভাবশালী নারীর তালিকায় যখন রিকতা আখতার বানুর নাম নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা চলছে। তখন রিকতা আখতার বানু স্বপ্ন দেখছেন তাঁর বিদ্যালয়টি কবে আবাসিক হবে। এসব প্রতিবন্ধী শিশুরা দূর-দূরান্ত থেকে আসে, কবে তিনি এসব শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার দিতে পারবেন।
রিকতা আখতার বানু প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, এখনো আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধী শিশুদের বৈষম্যের চোখে দেখা হয়। সমাজ থেকে প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি সামাজিক বৈষম্য যেদিন শেষ হবে। এসব শিশুরা যেদিন স্বাভাবিক ভাবে সমাজের সকলের সাথে হাসিমুখে চলাফেরার সুযোগ পাবে সেদিন একজন প্রতিবন্ধী মা হিসাবে আমার যুদ্ধের শেষ হবে।