সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১১:৫৭ অপরাহ্ন

কক্সবাজারে ইয়াবা সম্রাট আনোয়ারের উত্থান যেভাবে !

কক্সবাজারে ইয়াবা সম্রাট আনোয়ারের উত্থান যেভাবে !

## দুই পুলিশ কর্মকর্তার যোগসাজশে ইয়াবা সাপ্লাই। 
##নিয়মিত জলসা বসানো হয় আনোয়ারের অট্টালিকা ভবনে!
## ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে ব্যবহার করে সবকিছু সুবিধা নিত আনোয়ার।
## আনোয়ারের বোন মাহফুজা পুলিশ, ছাত্রলীগ সাদ্দামের নিয়মিত ডেটিং গার্লস হিসেবে থাকত ।

মনসুর আলম মুন্না ( কক্সবাজার )

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের নিদানিয়া এলাকার ইয়াবার এক নতুন সম্রাটের সন্ধান মিলেছে।  নাম আনোয়ার।  দৃশ্যমান কোন ব্যবসা বাণিজ্য না থাকলেও মনে হবে যেন কোন মন্ত্রী বা এমপি পুত্রের চালচলন।  অনেকেই বুঝতেই পারবেন না যে তার একসময়ের পারিবারিক অবস্থার যে বেহাল দশা ছিল সে বিষয়ে।  কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইয়াবা পাচার করে কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়িয়েছে এই ইয়াবা মাপিয়া আনোয়ার।  আনোয়ার দীর্ঘ বছর ধরে  আলোচনায় না আসলেও এখন সরকারের পঠ পরিবর্তনের ফলে বেরিয়ে পড়েছে একেকজন অবৈধ মাপিয়াদের তলের বিড়াল।  এসব মাদক কারবারি ও অবৈধ মাপিয়ারা প্রতিদিন কোন না কোন কারণে ধরা খাওয়ার পর অনেকেই ছদ্মবেশে চলাফেরা করার একটি কৌশল অবলম্বন করেছেন।  এর ভিতরে নিদানিয়া এলাকার আনোয়ারের কারিশমার সন্ধান খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে একেরপর এক ভয়ংকর মাদকের ট্রানজেকশনের তথ্য।

আনোয়ারের পিতার নাম সৈয়দ নুর।  দীর্ঘ ৩০ বছর যাবৎ পেরালাইজড’এ আক্রান্ত (অর্থাৎ পঙ্গুত্ব)। এক পা’ এক হাত’ পুরোটাই অচল। তখন থেকেই সংসার চালাতে হিমশিম খেত। কিন্তু পরিবারের অভাব অনটন লেগে থাকার সূবাধে ছোট থেকে ছেলে আনোয়ার বিভিন্ন জায়গায় দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালানোর হাল ধরেছিল।  বয়স এবং পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন ভুনত এই আনোয়ার।  কোন এক অদৃশ্য কারণে প্রস্তাব পাই ইয়াবা ব্যবসা করতে। এই ইয়াবা ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার স্বপ্নও যেন তার কমতি ছিলনা। এরপর দীর্ঘ তিন বছর যাবৎ পুরোদমে ইয়াবা ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার  সম্পত্তির পাহাড় গড়িয়েছে এই ইয়াবা মাপিয়া আনোয়ার।

প্রতিবেদেকের টানা ১৫ দিনের অনুসন্ধানের তথ্যে উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, স্বৈরাচার সরকার পতনের পর থেকে তার বিরুদ্ধে একের পর এক লূমহুর্ষক তথ্যের বর্ণনা।  উখিয়া উপজেলা রোহিঙ্গা শরণার্থী ১১ নং ক্যাম্প থেকে তার বিভিন্ন বিশ্বস্ত ইয়াবা বহনকারীর মাধ্যমে ইয়াবা এনে কক্সবাজারের হোটেল -মোটেল জুন ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাচারের মাধ্যমে অবৈধভাবে এই মাদক কারবারি কাজ পরিচালনা করেছেন। আনোয়ারের বোন মাহফুজা বেগম প্রতি সপ্তাহে এনজিওতে চাকরি করার তকমা দিয়ে দুটি করে ইয়াবার চালান আসার তথ্যও পাই এই প্রতিবেদক। পাশাপাশি কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসেনের স্ত্রী পরিচয়ে দীর্ঘ বছর ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ইয়াবা পাচারে সক্রিয় ছিল মাহফুজা । কিন্তু স্বৈরাচার সরকার পতনের পর এলাকার সকল ধরনের সচেতন মানুষ আনোয়ার ও তার বোন মাহফুজার ইয়াবা বাণিজ্যের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসেনকে ব্যবহার করে ইয়াবা ব্যবসাকরে  কোটি কোটি টাকা কামায় করে এখন বিভিন্ন জায়গায় অট্টালিকা ভবন ও নামি-দামি উচ্চ দামের জায়গা ক্রয় করার সন্ধান মিলেছে। এদিকে হঠাৎ এই কয়েক বছরের ভিতরে এত সম্পত্তি ও কোটি কোটি  টাকার মালিক হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। অবাক করা কান্ড যেন সচেতন মহলের মনে জাগছে।

জানা যায় যে,  গত আগস্ট মাসে নিদানিয়া প্রাইমারি স্কুলের সামনে মৃত বদিউল আলম চৌধুরীর স্ত্রী’র কাছ থেকে ৭০ লক্ষ টাকা দিয়ে একটি জায়গা ক্রয় করেছেন।  পাশাপাশি একই এলাকায় ৭ তলা বিশিষ্ট একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণের কাজ চলমান। যার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন উদ্ভোদন করেছেন স্বৈরাচার সরকারের আওয়ামী ছাত্রলীগের কক্সবাজার জেলা সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসেনকে দিয়ে। ইতিমধ্যে  যার মধ্যে চার তলা পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন হয়েছে।  এদিকে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কয়েক কোটি টাকার সম্পদ ক্রয় করেছেন ইয়াবা আনোয়ার।  এদিকে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দামের একান্ত বিশ্বস্ত সহযোগী হয়ে আনোয়ারের এই ইয়াবা ব্যবসার সমস্ত প্রশাসনিক শেল্টার দিতেন ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির এসআই শাহজাহান ও এএসআই রেজাউল করিম। এর কারণে প্রতি চালানে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন এই দুই অসাধু কর্মকর্তা।  তাদের নেতৃত্বে প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন আনোয়ারের বাড়িতে জলসা বসানো হয়। আয়োজন হয় নানা ধরনের মাদক থেকে শুরু করে নানা আপত্তিকর রমরমা বেপরোয়া কান্ড।

এদিকে দীর্ঘ এই সুত্র ধরে জানতে পারি যে,  ১১ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সবচেয়ে আলোচিত ইয়াবা ব্যবসায়ী রোহিঙ্গা জুবায়ের ও নিদানিয়ার আনোয়ার মিলে দীর্ঘ বছর ধরে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু তাদের অবৈধভাবে ক্ষমতাশীন দল এবং অবৈধ সুবিধাগ্রহণকারী পুলিশের সহযোগিতা থাকায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।  এবিষয়ে প্রশাসনে পক্ষ থেকে তেমন কোন পদক্ষেপ ছিলনা বললেই চলে। আনোয়ার নিদানিয়া এলাকায় স্বৈরাচার সরকার থাকা অবস্থায় এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত লাভ করে।  তার নেতৃত্বে বেপরোয়া যতসব তান্ডব চালানো হত সবকিছুর শেল্টারদাতা ছিল ছাত্রলীগের এই সভাপতি সাদ্দাম।  সাদ্দাম একাধারে আনোয়ারের বোন মাহফুজাকে নিয়ে প্রাইভেট কারে করে ঘুরে বেড়াত। যিনি এলাকায় সাদ্দামের স্ত্রী হিসেব এলাকার লোকমুখে বলে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সেটি তার রাতের প্রাইভেট ডেটিং গার্লস হিসেবে জানা যায়।  এর সুযোগে এলাকায় একটি অবৈধ নেতৃত্বের ইয়াবার রাজত্ব গড়ে তুলেছিল।  তার এসব অবৈধভাবে গড়ে উঠা সম্পদের বিবরণে সর্বোচ্চ মূল ১০০ কোটি টাকারও অধিক।  তবে এমন সম্পদের দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ইতিমধ্যে একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করার আশ্বাস দিয়েছে।  তার অবৈধ সম্পদের তথ্য বিবরণী নিতে একটি কমিটি গঠন করার মাধ্যমে হাজির করার আশ্বাস দেন এক দুদক কর্মকর্তা।

এবিষয়ে স্থানীয় এক সচেতন ব্যক্তি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন,  আনোয়ার একজন পঙ্গুত্ব পিতার সন্তান।  যার ঘরে নুন আনতে পান্তা ফুরানো বিষয়টি লেগে থাকত।  সেখানে হঠাৎ চোখের ফলকে আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো এত উত্থান কীভাবে হয়। আমরাও যেন হতবাক।  বিষয়টি যদি সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ খতিয়ে দেখলে তার আসল স্বফলতার গল্প বেরিয়ে আসবে।আনোয়ার নিয়মিত ইনানী পুলিশ ফাঁড়িতে সময় কাটান। গ্রেফতারকৃত ইয়াবাগুলো পুলিশ ফাঁড়ির এসআই শাহজাহান ও এএসআই রেজাউল মিলে আনোয়ারের মাধ্যমে বিক্রি করত বলে জানতে পারি।এবিষয়ে আনোয়ারের মুঠোফোনে কথা বলে জানা যায় যে,  আনোয়ার নিজেকে তৎকালীন জমিদার বংশের ছেলে পরিচয় দেন। পাশাপাশি তিনি কোন ছাত্রলীগের সভাপতিকে ছিনেন না বলে দাবী করেন।  এবং তিনি ইয়াবা ব্যবসা করেন না বলে দাবী করেন।  আরেক প্রশ্নের উত্তরে আনোয়ার বলেন, আমার বোন মাহফুজা এনজিওতে চাকরি করেন,  ১১ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে ইয়াবা আনার বিষয়টি সঠিক না।  এটি আমাকে ফাঁসানোর জন্য আমার এসব তথ্যগুলো আপনাকে দিয়েছে ভাইয়া। আমি আপনার অফিসে আসব।  আর ডকুমেন্ট ছাড়া নিউজ করতে পারবেন না আপনি। আপনি আমার পরিচয় জানলে এমন প্রশ্ন করতেন না। আমাকে ইয়াবা ব্যবসার বিষয়ে আর কখনোও জিজ্ঞেস করবেন না। আপনি আমি মাদক ব্যবসা করি যে সেটা জিজ্ঞেস করতে পারেন না। তাই পরে কথা বলব।

এবিষয়ে জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এর বক্তব্যে জানতে পারি যে,  তিনি এবিষয়ে জানেন না। যদি আনোয়ার নামের এই ব্যাক্তি যদি কোন ইয়াব কারবারি হয়ে থাকে তাকে প্রসাশনিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রয়োজন বলে মনে করেছেন।ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির এসআই শাহজাহান এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ না করার কারণে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এবং ওয়াটসআপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি।  এদিকে একই ফাঁড়ির এএসআই রেজাউলের কাছে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে তাকে চিনেন এবং জানেন অকপটে স্বীকার করলেও পরবর্তী মাদক ব্যবসার কথা বলে প্রশ্ন করা হলে এবিষয়ে অবগত নন বলে জানান।  তবে তার বাড়িতে যাওয়ার যে কথা  বলা হচ্ছে তা সম্পুর্ন বানোয়াট বলে দাবী করেন।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |