রবিবার, ২১ Jun ২০২৬, ১২:১৯ অপরাহ্ন

সাবেক ইউএনওর যোগসাজশ ৬০০ শিক্ষককের বেতন আত্মসাৎ করে লাপাত্তা এনজিও

সাবেক ইউএনওর যোগসাজশ ৬০০ শিক্ষককের বেতন আত্মসাৎ করে লাপাত্তা এনজিও

>  ছয়শ’ শিক্ষকের ৮৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা আত্মসাৎ

>  স্থানীয়দের চা-বিস্কুট খাইয়ে ছবি তুলেই শেষ ক্লাসের কার্যক্রম

>  যেকোন মূল্যে প্রাপ্য সম্মানী চান শিক্ষকরা

>  ভাগবাটোয়ারা করেই টাকা শেষ, কীভাবে দিবো বেতন: সীড কর্মকর্তা

সাইফুল ইসলাম, নান্দাইল: ছয়শ’ শিক্ষকের ছয় মাসের বেতন আত্মসাৎ করে সোসিও ইকোনমিক অ্যান্ড এনভারমেন্ট ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (সীড) নামক এনজিও’র কর্মকর্তারা লাপাত্তা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি এই ঘটনায় সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) যোগসাজশ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলায়। জানা গেছে, ২০১৯ সালে “স্বাক্ষরতা অর্জন করি, দক্ষ হয়ে জীবন গড়ি” এই পতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর আওতায় দেশের ৬৪ জেলায় ছয় মাস মেয়াদী দেশব্যাপী ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী অক্ষর জ্ঞানহীন মানুষের স্বশিক্ষিত ও জ্ঞান বিকাশের লক্ষ্যে ‘মৌলিক সাক্ষরতা’ নামে একটি প্রকল্প চালু করে সরকার। নান্দাইল উপজেলায় এই প্রকল্পের দায়িত্ব পায় সোসিও ইকোনমিক অ্যান্ড এনভারমেন্ট ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি নামের একটি এনজিও।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পে নান্দাইল উপজেলায় সর্বমোট ৬৮০ জন পুরুষ ও নারী শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়। এমনকি বিভিন্ন-গ্রাম ও ইউনিয়নকেন্দ্রীক ৩৪০টি কেন্দ্র পরিদর্শনের দায়িত্ব দেওয়া হয় ১৭ জন সুপারভাইজারকে। প্রতিদিনের দুই শিফটে পাঠদানের সময় ছিল দুই শিফটে দুই ঘণ্টা। এরপর করোনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি শিক্ষা কার্যক্রম আবারও শুরু হয়। অবশেষে ছয় মাসের এই প্রজেক্ট শেষ হয় ২০২২ সালের জুন মাসে। তবে সেই সময়ে শিক্ষকদের বেতন না দিয়েই লাপাত্তা হয়ে যায় এনজিওর কর্মকর্তারা।
শিক্ষকদের অভিযোগ, ২৪’শ টাকা মাসিক বেতন হিসেবে ছয়শ’ শিক্ষকের ৮৬ লাখ ৪০ হাজার টাকারও বেশি আত্মসাৎ করে লাপাত্তা হয়েছেন ওই এনজিওর কর্মকর্তারা। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত সম্মানী ভাতার টাকা পাচ্ছেন না নিয়োগকৃত শিক্ষক-শিক্ষিকারা। কিছু শিক্ষক দলীয় প্রভাব ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের ধরে নানা মাধ্যমে বেতন উদ্ধার করলেও এখনও প্রায় ছয় শতাধিক শিক্ষক বঞ্চিত রয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো কেন্দ্রে দু-এক দিন স্থানীয়দের ডেকে চা-বিস্কুট খাইয়ে ছবি তুলে ক্লাসের কার্যক্রম শেষ করা হয়। বিভিন্ন কেন্দ্রে বই-খাতা দেওয়া হলেও প্রকল্প শেষেও বাঁধা অবস্থাতেই রয়ে গেছে বইপত্র। আবার কোনো কোনো এলাকায় এই কার্যক্রম সম্পর্কে কিছুই জানে না স্থানীয়রা।
চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক মো. সোহাগ মিয়া বলেন, নিয়োগের চুক্তি অনুযায়ী বেতন পাওয়ার কথা প্রতি মাসে ২৪০০ টাকা করে, প্রকল্প শেষ হওয়া ১ বছর সাত মাস হলেও এখনো এক টাকাও বেতন পাইনি। অথচ কতো আশা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। আমরা গ্রামের মানুষ, বেতনের টাকা অল্প হলেও এটা আমাদের কাছে অনেককিছু। যেকোন মূল্যে আমরা আমাদের প্রাপ্য সম্মানী চাই। নিয়োগপ্রাপ্ত আরেক শিক্ষক ফাতেমা আক্তার অভিযোগ করেন বলেন, ছয় মাসের প্রকল্প শেষ প্রায় দুই বছর হয়ে যাচ্ছে, এখনো বেতন পাননি। আমরা তো হাওয়ার উপর কাজ করিনি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটা প্রকল্পে কাজ করেছি। তাহলে কেন আমাদের এই প্রকল্পের দায় সরকার নিবে না? আমরা আমাদের টাকা ফেরত চাই এবং দোষীদের শাস্তি চাই। এদিকে নাম প্রকাশ না শর্তে প্রকল্পটির এক সুপারভাইজার বলেন, প্রকল্প শেষে সুপারভাইজারদের কিছু টাকা দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিলো পর্যায়ক্রমে শিক্ষকদেরও দেওয়া হবে। কিন্তু দুই বছর হয়ে যাচ্ছে এখনো শিক্ষকদের বেতন দিচ্ছে না। এমনকি ফোন দিলে তারা ফোনও ধরছে না। এখন আমরা তো এলাকার মানুষ, আমরা আছি বিপদে।
মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের নান্দাইল উপজেলা প্রোগ্রাম অফিসার নাদিরা আজহারী জানান, প্রকল্প শেষে এনজিওর কাছে সরকার টাকা দিয়েছে। এই উপজেলায় ৩৪০টি কেন্দ্রে দুই শিফটে ৬৮০ জন শিক্ষক কাজ করেছে। কিন্তু তারা এখনো বেতন পাননি, এটা খুবই দুঃখজনক। এই প্রকল্পের সার্বিক সহযোগিতা ছিলেন সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার (আবুল মনসুর) স্যার। আমি যতটুকু জানি সরকার এনজিওর কাছে প্রকল্প শেষ হওয়ার সাথে সাথে বিল পরিশোধ করে দিয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমি বিষয়টা জানতে পেরেছি কিছুদিন আগে। আগে জানতে পেলে হয়তো বেতন বিষয়ে কিছু তদারকি  করতে পারতাম। তারপরও আমি সীডের পরিচালক হান্নান মল্লিককে বলেছিলাম শিক্ষকদের বেতন বেতন দিয়ে দিতে, তিনি বলছেন দিয়ে দিবে। কিন্তু এখনো কেন বেতন দিচ্ছে না এটা আমার জানা নেই। এখন আমার ফোন কেউ ধরে না। যদি শিক্ষকরা বেতনটা পেয়ে যেতো তাহলে আমিও শান্তি পেতাম।
সোসিও ইকোনমিক অ্যান্ড এনভারমেন্ট ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক হান্নান মল্লিকের কাছে মোবাইল ফোন জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন আর এইগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করলে লাভ নেই। সবকিছু ম্যানেজ করেই শেষ হয়েছে। শিক্ষকদের বেতন এর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাগবাটোয়ারা করেই টাকা শেষ। কীভাবে দিবো বেতন? এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।এবিষয়ে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী অফিসার অরুন কৃষ্ণ পাল বলেন, এই প্রকল্পের বিষয়ে আমি অবগত নই। তবে অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্হা নেওয়া হবে।

শেয়ার করুন

Comments are closed.




দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ © All rights reserved © 2025 Protidiner Kagoj |