এক নারীর সফলতার গল্প

মোস্তফা কামাল , চবি সংবাদদাতা

প্রকাশিত: ১১ মে, ২০২৫, ০৩:০৯ পিএম

পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’। নারী ও পুরুষকে এভাবেই দেখেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বর্তমানে নারীরা কোনো কাজেই পিছিয়ে নেই। তারা তাদের নিজ যোগ্যতায় এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ঘরে বাইরে সব পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করছে। সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। অনলাইন ব্যবসায়ের প্রবর্তনের ফলে নারীরা আরও বেশি পরিমাণে সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হচ্ছে। বলছি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা  বিভাগের ছাত্রী তানজিনা ইয়াসমিন প্রমির কথা।

ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকি, রংতুলির সঙ্গে বন্ধুত্ব। সময় পেলেই রংতুলি নিয়ে বসে যেত সে।তখন থেকেই ফ্যাশন বা ড্রেস ডিজাইনের প্রতি ছিল তার বরাবরই আকর্ষণ । ছোট বেলা থেকেই প্রমি ক্রফটিং করে আর কাগজ কাপড় ক্লে হাতের কাছে থাকা বিভিন্ন ফেলনা জিনিস দিয়ে এটা সেটা বানাতেন ।সেগুলো এক, একজন এসে পছন্দ করতো তিনি গিফট করে দিতেন।ইউটিউব থেকে দেখে দেখে অনেক কিছু বানাতেন।চারুকলায় পড়ার সুবাদে  রঙ বিভিন্ন ধরনের ম্যাটেরিয়ালস সম্পর্কে ধারণা জন্মে এবং সেখান থেকেই নিজে নিজে কাজ গুলো করতে করতে শেখা হয়েছে।এর বিনিময়ে যে কখনো টাকা নিবো এমন চিন্তা আসেনি প্রমির।

নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তা প্রমি।প্রথমে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার কোনো পরিকল্পনা ছিল না তার। পরিবারের বিপরীতে গিয়ে চারুকলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর নিজে উদ্যােক্তা হওয়ার পরিকল্পনা করেন। তিনি দেখতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইবোন, বন্ধু-বান্ধবীরা যার যার মতো উদ্যোগী হওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। কেউ পোশাক, কেউ বা ড্রাই ফুডস, কেউ হ্যান্ড পেইন্টেড ড্রেস, কেউ বা কসমেটিকস আইটেম ইত্যাদি অনলাইনে বিক্রি করছেন। তিনিও তাদের পথ অনুসরণ করলেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি অনলাইনে পোশাক ব্যবসা শুরু করলেন। যাত্রা শুরু হল কিভাবে এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রমি বলেন,

তখনই শুরু হলো শূন্য থেকে শুরুর গল্প। প্রথমে ব্যবসা করাটা সহজ ছিল না। আমি ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ভর্তি হয়।একে তো পুঁজি নেই, তার ওপর পরিবারের অমতে চারুকলায় ভর্তি হয়েছি।তখনি একজেদ চেপে বসেছিল মনে এখন থেকে আমার পড়াশুনার কোনো খরচ পরিবার থেকে নিবো না। ।শুরুর দিকে কোনো টিউশনও পাচ্ছিলাম না। জমানো কিছু টাকা ছিল যা দিয়ে টেনে টুনে এক মাস যায়।একটা আর্নিং সোর্স খুব দরকার ছিল।সেখান থেকেই বিজনেস আইডিয়া মাথায় আসে।

 

প্রথমে আমার মাথায় যেই আইডিয়াটা আসে সেটা হলো মাটির জিনিস পত্র বানানো।চারুকলায়  জুয়েলারী বানানোর জন্য উপযোগী মাটি ছিল।  সেখান থেকে প্রথম প্রথম মাটির তৈরি গহনা বানিয়ে নিজের আইডি তে পোস্ট দিতাম।এসব দেখে আমার এক বান্ধুবি পহেলা বৈশাখের জন্য একটা গয়না কাস্টোমাইজ অর্ডার দেয়।আমি জানতাম না ওই গুলো যে কাঠের গয়না। আমার এক বান্ধবী পরামর্শ দেয় চট্টগ্রামের একটা পাইকারি মার্কেট আছে যেখান কাঠের ম্যাটেরিয়ালস পাওয়া যায়।সেগুলো দিয়ে জুয়েলারি বানানো হয়।আমি সেই দোকানে গিয়ে ৫৭০ টাকার কাঠের ম্যাটেরিয়ালস কিনি। এটা ছিল আমার প্রথম ইনভেস্ট। এখান থেকে ব্যাবসার সূচনা। দ্বিতীয় বার এক বন্ধু থেকে ১৬০০ টাকা ধার করে পুনরায় ইনভেস্ট করি।এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।লাভের অংশ টা দিয়েই আমি জিনিস পত্র কিনতাম।

এভাবে করতে করতে আজ আমার মাসিক আয় ২০-৩০ হাজার টাকা।তবে কখনো কখনো এর থেকে কম বেশি হয়। আমার পন্য গুলো শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়৷ দেশের বাহিরের ক্রেতারা অনলাইনে পন্য অর্ডার দিচ্ছে  যে মাস গুলোয় প্রোগ্রাম বেশি থাকে সে মাসে আরো বেশি সেল হয়।আমি যখন এই বিজনেস টা স্টার্ট করি তখন কাঠের জুয়েলারী বানাতো এমন মানুষ খুব কম ছিলো।চারুকলায় এক দুইজন বানাতো। এরপর যখন দেখি আমার সিনিয়র কয়েকজন সেম জিনিস নিয়ে বিজনেস করেন আমার বিজনেস আইডিয়াটা চেঞ্জ করি।আমার সব সময় ইউনিক কিছু করতে ভালো লাগে।তখন আমি আর্টিফিসিয়াল ফুল দিয়ে গায়ে হলুদের গয়না বানানো স্টার্ট করলাম এরমধ্যে করোনায় হঠাৎ করে সব থমকে গেলো।

 

ম্যাটেরিয়ালস কিনতে বাইরে যেতে পারছি না। আমার 'রঙ' নামে একটা পেজ ছিল।পেজ টা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।সে সময়ে বাসায় আগে থেকে কিনে রাখা কিছু কুশি সুতা ছিলো।ইউটিউব দেখে দেখে সেই বন্দী জীবনকে একটু কর্মঠ করতে কুশি কাজ শেখা শুরু করলাম।বাচ্চাদের কুশি জুতা, জামার গলা,কুশি লেস কুশি জুয়েলারী অনেক কিছু বানিয়েছি।এটাও আমার ব্যাবসার একটা অংশীদার হয়ে গেলো।

প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন কি-না জানতে চাইলে বলেন, 'একজন নারী উদ্যোক্তার লড়াইয়ের গল্প বলতে গেলে আসলে ঠিকঠাক বলা যায় না। কারণ, কেবল লড়াইয়ের সময়গুলোতে সমস্যার মুখোমুখি হলে অনুভূতিগুলো অনুভব করা যায়। একদিন আমার 'রঙ'পেজটা হ্যাক হয়ে সব শেষ হয়ে যাওয়ার অবস্থা।নতুন পেজ খোলার চিন্তা ভাবনা করছি সেই সময়ে পুরনো 'রঙ' পেজ টা ফেরত পেলাম।সেখানেই আবার শুরু করলাম।তবে হ্যাক হওয়ায় রিচ কমে গিয়েছিলো।কিন্তু আমি থেমে থাকিনি।নিজের আইডি তেই বিজনেস রিলেটেড সবকিছু পোস্ট করতাম।আর পরিচিত মানুষজনই আমার কাছ থেকে জিনিস কিনতো।বড় ধরনের কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হইনি। ছোটখাটো যেসব প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছিল, সেসব কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।

মাঝে মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রাম গুলোতে স্টল দেই।এরপর আমি ব্লক আর বাটিক করবো চিন্তা করি।যেই ভাবা সেই কাজ ইউটিউব দেখে এটাও শিখে ফেললাম।এসব কাজ আমি নিজের ভালো লাগা থেকে শিখেছি কিন্তু আমার কাজ দেখে আমার কাছ থেকে প্রোডাক্ট কিনতে চাইতো সবাই।সেভাবেই এগুলো আমার বিজনেসের প্রোডাক্ট হয়ে গেছে।এগুলো ছাড়াও আমি বর্তমানে হুপ আর্ট,ক্যানভাস পেইন্টিং, লিপ্পান আর্ট, ওয়াল পেইন্টিং,হ্যান্ড পেইন্ট শাড়ি,পাঞ্জাবি থ্রি পিস,ব্লক প্রিন্ট শাড়ি পাঞ্জাবি থ্রি পিস,কাপল সেট এসব করে থাকি।

উদ্যোক্তা জীবনের পর্যটকের নিজস্ব একটা ছন্দ থাকে। সে ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে এগিয়ে নেওয়াটাই হল জীবন। অনেক ঝড়-ঝাপটা সামলিয়ে উদ্যোক্তা জীবন কেমন লাগছে জানতে চাইলে প্রমি বলেন, 'কেমন লাগছে, সেটা এক বাক্যে প্রকাশের মতো না। মিশ্র একটা অনুভূতি। অনেক ভালো লাগে, যখন নিজের কাজ সম্পর্কে ভালো কোনো কথা শুনি। কখনো কাজের চাপে হাঁপিয়ে উঠি, হতাশা চলে আসে। তারপর আবার একটা ভালো খবর শুনে উৎফুল্ল হয়ে উঠি। এই তো, এভাবেই কেটে যাচ্ছে উদ্যোক্তা জীবনের দিনগুলি।'

উদ্যোক্তা জীবন মানেই ভালো-মন্দের সঙ্গে মানিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলা। সমাজে ঠিকে থাকতে হলে একজন নারী উদ্যোক্তাকে সামাজিকভাবে বহু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সময়ে-অসময়ে অনলাইনে বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়। অনেকের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার জীবন মোটেও সুখকর বিষয় হয় না। প্রতিনিয়ত লড়াই করে ব্যবসার কাজকে টিকিয়ে রাখতে হয়।

 

উদ্যেক্তা হয়ে এগিয়ে যাওয়ার পেছনে করো সাপোর্ট পেয়েছেন কি-না জানতে চাইলে বলেন,আমি যখন প্রথমে কিভাবে কাজ করবো জানতাম না যখন এক সিনিয়র ভাইয়া জোনায়েদ আমাকে পিভিসি দিয়ে কাজ করার আইডিয়া দেন। এরপর এটাতে কাজ করা বেশ কষ্ট সাধ্য ছিলো তখন আমার অবস্থা থেকে আমার কাছের এক বান্ধবী রিমা আমাকে পরামর্শ দেয় পাইকারি মার্কেটের। হাতে ধরে আমাকে সব জায়গা চেনায়। এরপর আমার কাছের একজন মানুষ সে সব থেকে বেশি আমাকে সাপোর্ট দিয়ে গেছে যার কথা না বললেই নয় ফাহিম। সমস্ত প্রতিবন্ধকতা গুলো অতিক্রম করার সাহস যুগিয়েছে। যখন মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে যাই আমাকে সাহস দেয় আবারও এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাই। শুরুর দিকে পরিবারের সাপোর্ট পাইনি স্বাভাবিক নতুন কিছু পরিবার মনে করেছিলো এই জিনিসের কোনো ভবিষ্যত নেই। তবে বর্তমানে আমার পরিবারের প্রতিটি মানুষ আমাকে সাপোর্ট করে উৎসাহ দেয়। আমার মা এখন অনেক সহযোগিতা করে পাশে থাকে। এছাড়া আত্মীয় স্বজনরাও আমার কাছ থেকে প্রোডাক্ট কিনে নেয় আমাকে হেল্প করার জন্য। এছাড়াও আমার সব বন্ধু বান্ধব আমাকে সব সময় সাপোর্ট দেয় কখনোই আমার কাজকে ছোট করে দেখে না। তাদের কাছে আমার ছোট উদ্দ্যোগ টাই অনেক বড় কিছু।

 

সবশেষে নিজের উদ্যোগের বিষয়ে প্রমি বলেন, 'সমাজের অনেক নারীই উদ্যোক্তা হতে চান, কিন্তু উদ্যোগ থাকলেও সুযোগ হচ্ছে না। আমি তাদের উদ্যোগকে ছড়িয়ে দিতে চাই। এ কারণেই আমার স্বপ্ন নারী উদ্যোক্তা তৈরি করা, যারা সফল হয়ে অবদান রাখবেন দেশের অর্থনীতিতে। পাশাপাশি নিজেও হবো একজন সফল উদ্যোক্তা। বর্তমানে বেকারত্ব বেড়েই চলছে। তবে আমি কিছুটা সফলও হয়েছি। আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার মাধ্যমে অনেক নারীর আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটাই আমার কাছে চরম পাওয়া।'

আমার স্বপ্ন একদিন নিজের একটা আউটলেট হবে আর দেশে অনেক নারী আছে যাদের কিছু করার ইচ্ছে আছে কিন্তু  ঘর থেকে বের হতে পারে না সামাজিক প্রতিবন্ধকতার জন্য। তাদেরকে বাড়িতে বসেই তাদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করে দেয়া।আমি চাই আমার প্রোডাক্টে সব সময় হাতের ছোঁয়া থাকুক।

Link copied!