স্মৃতির পাতা ও রাজপথের স্লোগান: এক অগ্নিময়ী নেত্রীর বিদায়

অনলাইন ডেস্ক , প্রতিদিনের কাগজ

প্রকাশিত: ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৬:১৪ পিএম

আজ আকাশের বুক ভারী, প্রকৃতি যেন স্তব্ধ। আমার হৃদয়ের গহীনে শুধু এক অব্যক্ত শূন্যতা। শুধু এটুকু জানি—আজ ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায় নিভে গেল। যাঁকে ঘিরে আমাদের যৌবনের উত্তাল দিনগুলো আবর্তিত হয়েছিল, যাঁর কণ্ঠে ভর করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পেয়েছিল দিশা, সেই আপোষহীন দেশনেত্রী, সেই মমতাময়ী মা—বেগম খালেদা জিয়া—আজ আমাদের ছেড়ে চিরবিদায় নিলেন। তাঁর জানাজায় দাঁড়িয়ে চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল আশির দশকের সেই অগ্নিঝরা অধ্যায়ের ছবি। সেসব স্লোগানের প্রতিটি অক্ষরে আজও জ্বলজ্বল করছে তাঁর সাহস, তাঁর দৃঢ়তা, তাঁর বৈপ্লবিক রাজনৈতিক জীবন।

আন্দোলনের দিনগুলি: প্রথম দেখা: 

১৯৮৮ সালের মে মাস। আমি তখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সাংগঠনিক শক্তি সংহত করার লক্ষ্যে আমরা পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য ঢাকায় আসি। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ধানমণ্ডি ২৭-এ গিয়ে দেখা করি তৎকালীন মহাসচিব ব্যারিস্টার আব্দুস সালাম তালুকদারের সাথে। তাঁর নির্দেশনায় টঙ্গী পৌর অডিটোরিয়ামে নভেম্বর ’৮৮-তে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনের সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব ছিল আমার কাঁধে। কিন্তু রাজনীতির পথ কখনোই মসৃণ নয়। সম্মেলনের পরেই শুরু হয় মতভেদ, গ্রুপিং ও অস্থিরতা—যা আন্দোলনের জন্য ছিল মারাত্মক হুমকি।

এই সংকটের খবর পৌঁছাল বেগম খালেদা জিয়ার কানে। ব্যারিস্টার সালাম তালুকদার আমাকে তলব করলেন। আমাকে নিয়ে গেলেন ম্যাডামের সামনে। সেই প্রথম এত কাছ থেকে দেখা আপোষহীন নেত্রীকে। তিনি খুব শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “তোমাদের কমিটি নিয়ে কী সমস্যা হয়েছে? আন্দোলনের এই ক্রান্তিলগ্নে দলের ভেতর কোন্দল আমি মেনে নেব না।” তিনি মহাসচিবকে দায়িত্ব দিলেন বিষয়টি সুরাহা করার।

নেত্রীর সেই নির্দেশনাই ছিল আমাদের জন্য শিরোধার্য। সেই রাতেই আমার হলের ৩০৭ নম্বর রুমে বসলো জরুরি বৈঠক। গভীর রাত পর্যন্ত চলল আলোচনা। শেষে সবার একটাই দাবি—বিভেদ মেটাতে হলে আমাকেই হাল ধরতে হবে। আমার ব্যক্তিগত অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, দলের স্বার্থে এবং ম্যাডামের নির্দেশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমি সভাপতির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলাম।ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন সভাপতির নাম হয়ে গেল মো আশরাফুর রহমান।

এক বিপ্লবীর জন্ম ও এক সংগ্রামের নাম বেগম খালেদা জিয়া: 

স্বৈরাচার এরশাদের সেনাশাসনের অন্ধকার সময়ে, যখন ভয়ের ছায়া রাজনীতির প্রতিটি অলিতে-গলিতে, তখন তিনি ছিলেন প্রতিবাদের প্রতীক। স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নির্ভীক নেতৃত্ব—তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন সংগ্রামের ইতিহাস। নারী হয়েও পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় তিনি প্রমাণ করেছিলেন—নেতৃত্বের শক্তি লিঙ্গে নয়, আদর্শে।

রাজপথের পথপ্রদর্শক: 

এরপর ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কমিটি আমার নেতৃত্বে গঠনের পর ম্যাডাম একদিন নিজেই আমাদের ডেকে নিলেন। ধানমণ্ডির সেই অফিস কক্ষে তিনি বসেছিলেন এক অদম্য প্রেরণার উৎস হয়ে। পাশে ছিলেন মহাসচিব। সেদিন তিনি আমাদের সামনে খুলে দিয়েছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপরেখা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ের কৌশল। তাঁর কণ্ঠে ছিল অগ্নিঝরা সাহস, চোখে ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই নির্দেশনাই আমাদের রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ার শেষ প্রেরণা যুগিয়েছিল।

কারাগারও থামাতে পারেনি তাঁর ভালোবাসা: 

১৯৯০-এর ডিসেম্বরে আন্দোলনের চূড়ান্ত লগ্নে যখন আমিসহ আমার সহযোদ্ধারা গ্রেফতার হয়ে গাজীপুর জেলে নিক্ষিপ্ত হলাম, তখনও তাঁর কণ্ঠস্বরই ছিল আমাদের মজবুতি। জেলে। কারাগারের চার দেয়ালও ম্যাডামের মমতা আটকাতে পারেনি। তিনি আমাদের মুক্তির দাবিতে কঠোর অবস্থান নিলেন। তাঁরই দৃঢ়তার ফলে অল্প দিনের মধ্যেই আমরা মুক্তিলাভ করি। আর তার অল্প পরেই ইতিহাস সৃষ্টি হলো—পতন হলো স্বৈরশাসকের, পতন হলো স্বৈরাচার এরশাদের। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একধাপ জাতি এগিয়ে গেল।

একজন রাষ্ট্রনায়ক, একজন মা: 

৮০ দশকের আন্দোলনের ফসল ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে একটি সুষ্ঠু,অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া।১৯৯১-এর নির্বাচনে জনগণের বিপুল ভোটে তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে শাসনভার গ্রহণ করলেন। গণতন্ত্রের সেই মহাবিজয়ের পর আমি ফিরে গেলাম আমার পড়াশোনায়। বিসিএস-এর মাধ্যমে পুলিশ ক্যাডারে যোগ দিয়ে সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হই। পেশাগত বিধিনিষেধ ও শৃঙ্খলার কারণে তারপর আর কখনো সরাসরি তাঁর সান্নিধ্য পাইনি। কিন্তু দূর থেকেই বরাবর দেখেছি কিভাবে তিনি দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলেন, নারী শিক্ষার প্রসারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেন এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আজীবন আপোষহীন থেকে গেলেন। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই এক ‘রাজনীতির যোদ্ধা’।হয়ে উঠলেন আপোষহীন নেত্রী,সময়ের পরিক্রমায় তিনি সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হলেন।

দেশনেত্রীর অমর কীর্তি ও অবদান: 

এই শোকের মুহূর্তে তাঁর কিছু বিশেষ কর্ম ও অবদান স্মরণ না করলেই নয়, যা তাঁকে ‘দেশনেত্রী’ এবং ‘আপোষহীন নেত্রী’র উপাধিতে ভূষিত করেছে:

১. সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন: ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর তিনি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন, যা জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়। ২. নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন: বাংলাদেশে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা চালু করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর, যা নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। ৩. আপোষহীন নেতৃত্ব: দীর্ঘ ৯ বছর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন অবিচল। কোনো প্রলোভন বা ভয়ে তিনি মাথা নত করেননি, যা তাকে ‘আপোষহীন’ খেতাব এনে দেয়। ৪. ভ্যাট (VAT) প্রবর্তন: দেশের অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করতে তিনি ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করেন, যা আজ দেশের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস। ৫. মুক্ত বাজার অর্থনীতি: বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক মানের করার লক্ষ্যে তিনি মুক্ত বাজার অর্থনীতির দ্বার উন্মোচন করেছিলেন।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর কর্ম এবং ত্যাগের ইতিহাস বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

চিরবিদায়: 

আজ, ৩০শে ডিসেম্বর ২০২৫ ভোর ৬ ঘটিকায় এভারকেয়ার হাসপাতালে সেই অপরাজেয় যোদ্ধা পরলোকগমন করেছেন। তিনি রেখে গেছেন একটি অমর আদর্শ, একটি সাহসী সংগ্রামের ইতিহাস এবং লক্ষ্য মানুষের হৃদয়ে অফুরান ভালোবাসার স্থান। ম্যাডাম, আজ আমরা আপনাকে চিরবিদায় জানালাম। কিন্তু আপনি বেঁচে আছেন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে, বেঁচে আছেন স্বাধিকার চেতনা প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। আমার মতো কোটি কর্মী ও সমর্থকের অন্দরমহলে আপনি চিরদিনই থাকবেন এক প্রেরণাদায়ী নেত্রী, এক মমতাময়ী মা।

আল্লাহ পাক আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আপনি ভালো থাকুন।

লেখক : 

ড. মো. আশরাফুর রহমান

ডিআইজি 

বাংলাদেশ পুলিশ, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা।

Link copied!